বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০৭:৪৯:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
সাংবাদিকদের কল্যাণে ডিআরইউর পাশে থাকার আশ্বাস
বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করে না, বরং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়ন, কল্যাণ, চিকিৎসা সহায়তা, গ্রামীণ সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যমের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। সভায় ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল সংগঠনের তরফে সাংবাদিকদের পেশাগত ও কল্যাণমূলক বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই এগোতে চায়। পেশাদার সাংবাদিকদের কল্যাণ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যমের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ডিআরইউর পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সাংবাদিকতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষে নয়। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে, এটাই সরকারের অবস্থান। এর আগে এপ্রিল মাসেও তিনি বলেছিলেন, সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না এবং গণমাধ্যমকে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়।
তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নামে-বেনামে অসংখ্য পেজ, ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল ও ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্ম থেকে নানা ধরনের তথ্য ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এতে সমাজে বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।
অনেকেই হাতে একটি মোবাইল ফোন নিয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সামাজিকমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত সাংবাদিক কারা, সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণে কী ধরনের মাপকাঠি থাকা উচিত, এ বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন।
এ জন্য সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে আলোচনা করে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা ও পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ডিআরইউসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণের একটি গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি থাকা দরকার। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা, নতুন নীতিমালা এবং সাংবাদিকদের জন্য অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিক চিহ্নিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।
সাংবাদিকদের কল্যাণ তহবিলকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করা পেশাজীবীদের অনেকেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের পেশাগত নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, কল্যাণ ও সরকারি সহায়তার আওতা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
অসুস্থ ও অসচ্ছল সাংবাদিকদের চিকিৎসা সহায়তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সাংবাদিক কল্যাণ তহবিলের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত অসুস্থ সাংবাদিকরা যাতে প্রয়োজনের সময়ে চিকিৎসা সহায়তা পান, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে মতবিনিময় সভায় উঠে আসে।
সাংবাদিকদের জন্য সময়োপযোগী ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়েও সরকারের আন্তরিকতার কথা জানান ইয়াসের খান চৌধুরী। বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের দিকে সরকার নজর দিচ্ছে। এ বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি।
গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য একটি সমন্বিত ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। পরিবর্তিত প্রযুক্তি, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং সাংবাদিকতার পেশাগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং অপসাংবাদিকতা ও ভুলতথ্য মোকাবিলার মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেও তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, বরং সাংবাদিকদের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে চায়। সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
মতবিনিময় সভায় ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন সাংবাদিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সমস্যাগুলো দেখার দায়িত্ব তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের। ডিআরইউ সাংবাদিকদের কল্যাণ ও সমস্যা সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। সাংবাদিকরা বর্তমান সরকারকে গণমাধ্যমবান্ধব হিসেবে দেখতে চান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ডিআরইউ একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রায় ২ হাজার পেশাদার সাংবাদিকের কল্যাণ ও পেশাগত মানোন্নয়নে কাজ করছে। বছরজুড়ে সংগঠনটি শতাধিক কর্মসূচি আয়োজন করে থাকে। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে সাংবাদিকরা যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মতবিনিময় সভায় ডিআরইউর সহসভাপতি মেহদী আজাদ মাসুম, দপ্তর সম্পাদক রাশিম মোল্লা, নারী বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না, ক্রীড়া সম্পাদক ওমর ফারুক রুবেল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মনোয়ার হোসেন, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আখতার হোসেন, আলী আজম, মাহফুজ সাদি, আল আমিন আজাদ ও আব্দুল আলীম উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাদের পেশাগত ও কল্যাণমূলক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা সহায়তা, ওয়েজ বোর্ড, গ্রামীণ সাংবাদিকদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং একটি সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগকে তিনি সরকারের গণমাধ্যম-সম্পর্কিত কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন।










