পেঁয়াজ-আলুর দামপতনে কৃষকের কান্না, `কৃষিপণ্য কমিশন গঠনের দাবি’
- আপডেট সময় : ০৪:০২:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ ও আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। বাজারে আলু প্রতি মণ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং পেঁয়াজ ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের পক্ষে চাষাবাদ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষকদের মতে, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবারে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সারের সংকট এবং উচ্চমূল্যের কারণে চাষের ব্যয় আরও বেড়েছে। অন্যদিকে ভরা মৌসুমে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দাম কমে গেছে। ফলে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে যেখানে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায়। এতে প্রতি মণে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
এ অবস্থায় অনেক কৃষক অপরিপক্ক পেঁয়াজ তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পেঁয়াজের আকার ছোট হওয়ায় বাজারমূল্য আরও কমে যাচ্ছে। একইভাবে নতুন আলুর বাজারেও ধস নেমেছে। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে ২০ টাকার বেশি খরচ হয়, সেখানে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী, নাটোর ও পাবনায় এবারে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। একইভাবে জয়পুরহাট, বগুড়া, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আলুরও ভালো ফলন হয়েছে। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে গেছে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবারে এলাকায় বিঘাপ্রতি প্রায় ৯৯ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
স্থানীয় কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে খরচ উঠছে না। অনেক কৃষক শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত দিতে পারছেন না। বালানগর গ্রামের কৃষক জয়েন উদ্দিন বলেন, ১ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি মাছও পাওয়া যায় না। অনেক কৃষক আবার লোকসানের আশঙ্কায় জমি থেকেই পেঁয়াজ তুলছেন না বলে জানা গেছে।
কৃষকরা জানান, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে বিঘায় ৭০ থেকে ৭৫ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করলে প্রায় ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। একইভাবে আলু চাষেও বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বহুদিন ধরে একটি কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন গঠনের দাবি জানানো হচ্ছে। তার মতে, এ ধরনের কমিশন গঠন করা হলে কৃষকের কাছ থেকে সরকার সরাসরি কৃষিপণ্য কিনে সংরক্ষণ করতে পারবে এবং সুবিধাজনক সময়ে বাজারে সরবরাহ করতে পারবে। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে বাজারও স্থিতিশীল থাকবে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি উপকরণ যেমন সার, বীজ ও কীটনাশকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যে নিম্নমানের বীজ বিক্রি করে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বীজের মোড়কে সরকার নির্ধারিত মূল্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করলে কৃষক প্রতারণা থেকে রক্ষা পাবেন।
কৃষক নেতারা মনে করেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবও বড় একটি সমস্যা। দেশে আলু সংরক্ষণের জন্য কিছু কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও পেঁয়াজ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে ভরা মৌসুমে কৃষকদের কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়। এজন্য প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি সেচের বিদ্যুতের বিল কমানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্য কৃষক নেতা নাসিরুল ইসলাম বলেন, দেশের বড় বড় মোকাম ও আড়তের পাশে সরকারি উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে গোডাউন নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে কৃষকরা পণ্য নিয়ে এসে তা সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং ভালো দাম পেলে বিক্রি করতে পারবেন। তিনি বলেন, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাগমারার মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এখানে প্রতি বছর ভালো ফলন হয়। এবারে উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে এবং দাম কমেছে। পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা সমস্যায় পড়ছেন বলে তিনি স্বীকার করেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে জানান তিনি।
কৃষকদের আশা, সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করলে এই সংকট থেকে তারা কিছুটা হলেও মুক্তি পাবেন। অন্যথায় আলু ও পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


















