উদ্যোগ পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত রেলযাত্রা, যাত্রীর প্রাণ বাঁচাতে এবার সিসিটিভি
- আপডেট সময় : ১১:০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ এক দশকে ১২ প্রাণহানি, আহত ও অঙ্গহানির শিকার প্রায় ৫০০
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর পাথর নিক্ষেপ ঠেকাতে ট্রেনে সিসিটিভি
আইন আছে, তবু থামছে না নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড, ঝুঁকির মুখে যাত্রীদের জীবন
জানালার ওপাশ থেকে ছুটে আসা পাথর কোনো যাত্রীর জীবনে স্থায়ী অন্ধকার নামিয়ে আনতে পারে
ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাত্রীদের আহত হওয়া এবং রেলওয়ের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে অবশেষে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির উদ্যোগ নিলো বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-কক্সবাজার রুটের পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাথর নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত করা এবং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে উদ্যোগটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কক্সবাজার রুটে পাথর ছোঁড়ার স্থানগুলো চিহ্নিত করে রেলওয়ের তরফে বলা হয়েছে, রামু, ইসলামাবাদ, ডুলাহাজারা, চকরিয়া ও হারবাং এলাকায় চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটছে। দিন কিংবা রাতে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙে যাত্রীরা গুরুতর আহত হচ্ছেন। এতে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ার পাশাপাশি রেলওয়ের মূল্যবান সম্পদেরও ক্ষতি হচ্ছে।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় গত এক দশকে বাংলাদেশে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৫০০ জন যাত্রী আহত বা অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। গত ১৮ অক্টোবর পাবনায় রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা ঢালারচর এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথরের আঘাতে সান্টু মিয়া (৩২) নামে এক যাত্রী গুরুতর আহত হন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চল ও কক্সবাজার রেলপথে গত দেড় বছরে অন্তত ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ রেলওয়ে কক্সবাজারের আইকনিক রেলস্টেশনে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনের দুই পাশে পরীক্ষামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন, মসজিদ-মাদরাসা ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ধারণ, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাথর নিক্ষেপের কারণে যাত্রীদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলেও এবার নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে উদ্যোগটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিও জরুরি। পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগ সফল হলে রেলওয়ের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ রুটেও সিসিটিভি নজরদারি সম্প্রসারণের পথ খুলতে পারে।

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ যেন রেলযাত্রীদের জন্য এক নীরব আতঙ্কের নাম। মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা দুর্বৃত্তের ছুড়ে দেওয়া একটি পাথর কেড়ে নিতে পারে মানুষের প্রাণ, চিরদিনের জন্য অন্ধ করে দিতে পারে চোখ, ভেঙে দিতে পারে দাঁত কিংবা কেড়ে নিতে পারে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড বন্ধে সচেতনতামূলক প্রচার ও আইনগত শাস্তির বিধান থাকলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে বাড়তি উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। রেলওয়ের তথ্যমতে ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার রেলপথে অন্তত ২৭টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এতে আহত হন অন্তত ১২ জন যাত্রী। রামু, ইসলামাবাদ ও ডুলাহাজারা এলাকায় এমন ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে জানায় রেলওয়ে।
রেলওয়ের পরিসংখ্যানে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে এক বছরে অন্তত ১৪৭টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন ৪০ জন যাত্রী। এর মধ্যে কক্সবাজার রুটে ৪০টি ঘটনায় ১৫ জন আহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়।
এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। তবে শুধু ঘটনা নথিভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোথায়, কখন এবং কীভাবে পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছে, কারা জড়িত, অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, এসব প্রশ্নের উত্তরও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
পাথরের আঘাতে বদলে যাচ্ছে জীবনের গতিপথ
চলন্ত ট্রেনের জানালায় আঘাত করা একটি পাথর মুহূর্তেই যাত্রীর মুখমণ্ডল, চোখ, মাথা কিংবা শরীরে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। জানালার কাচ ভেঙে গেলে কাচের টুকরো থেকেও বাড়তি আঘাতের আশঙ্কা থাকে। শিশু, নারী, প্রবীণ এবং জানালার পাশে বসা যাত্রীরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেনে পাথরের আঘাতে এক যাত্রীর চারটি দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঘটনা প্রকাশিত হয়। একই ঘটনায় আরেক যাত্রীও আহত হন। এমন ঘটনা প্রমাণ করে, পাথর নিক্ষেপকে নিছক দুষ্টুমি কিংবা শিশু-কিশোরের কৌতূহল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর পরিণতি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হারানো এবং একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়।

আইনে কঠোর শাস্তির বিধান
বাংলাদেশের রেলওয়ে আইন, ১৮৯০-এর ১২৬ ও ১২৭ ধারায় রেলপথে বিপজ্জনক বস্তু নিক্ষেপ এবং ট্রেনের যাত্রীদের নিরাপত্তা বিপন্ন করার অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ১২৭ ধারায় ট্রেনের বগিতে পাথর বা অন্য বস্তু নিক্ষেপ করে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিপন্ন করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান উল্লেখ আছে।
তবে অপরাধের ধরন, আঘাতের মাত্রা ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে মামলার ধারা ও শাস্তি নির্ধারিত হয়। পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় কারও মৃত্যু হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা প্রযোজ্য হবে, এমন নয়, হত্যার অভিযোগ ও তার উপাদান তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা কতটা শনাক্ত হচ্ছে, কতটি ঘটনায় মামলা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে কতজনের সাজা হচ্ছে। এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না হলে আইনের কঠোরতা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা মূল্যায়ন করা কঠিন।
প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট, শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালাতে হবে। পাশাপাশি রেললাইনের পাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
রেলওয়ের উচিত প্রতিটি ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা। যেসব এলাকায় বারবার পাথর নিক্ষেপ হচ্ছে, সেখানে সময় ও স্থানভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে টহল এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়াতে হবে। ট্রেনের জানালার নিরাপত্তা বাড়ানোর উপযোগী ব্যবস্থাও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বিবেচনা করা যেতে পারে।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ কোনো নিরীহ বিনোদন নয়; এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড। একজন যাত্রীর নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। তাই প্রয়োজন শুধু প্রচার নয়, নির্ভরযোগ্য তথ্য, জবাবদিহি, কার্যকর তদন্ত এবং অপরাধ প্রতিরোধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ। নইলে জানালার ওপাশ থেকে ছুটে আসা একটি পাথর বারবার কোনো যাত্রীর জীবনে স্থায়ী অন্ধকার নামিয়ে আনতে পারে।



















