ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না চীন তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস
- আপডেট সময় : ১০:২৭:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
তিস্তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম ভিত্তি
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে বেইজিং স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যেকোনো সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এতে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বা প্রভাব থাকা উচিত নয়।
বেইজিংয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি উন্নয়ন উদ্যোগ। প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয়, বাণিজ্য, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী বলেও তিনি জানান।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের বিশেষজ্ঞরা প্রথমবারের মতো যৌথ কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করবেন। দুই দেশ এ বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক প্রমাণিত হলে চীন প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দেবে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়নার মধ্যে তিস্তা প্রকল্প-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি আরও এগিয়ে যায় এবং দীর্ঘদিনের আলোচিত এই প্রকল্প নতুন গতি পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা প্রকল্প কেবল একটি নদী সংস্কার কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা হ্রাস, ভাঙন এবং অনিয়ন্ত্রিত চর জেগে ওঠার কারণে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত হলে পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এতে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের (চিকেনস নেক) নিকটবর্তী হওয়ায় নয়াদিল্লি এ প্রকল্পকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র স্থল যোগাযোগপথ হওয়ায় করিডরটির নিরাপত্তা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ওই অঞ্চলে চীনের অবকাঠামোগত সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, তিস্তা প্রকল্প একটি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ। এর লক্ষ্য সীমান্ত বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; বরং দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তিস্তা অববাহিকার লাখো মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং এটি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। একই সঙ্গে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে।



















