ঢাকা ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সমর্থন করে: তৌহিদ হোসেন প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচার চাইলে গণতান্ত্রিক সরকার অপরিহার্য, তারেক রহমান গোপালগঞ্জ-৩: প্রার্থিতা ফিরে পেলেন হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামানিক কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর ৫৬ পর্যবেক্ষক মোতায়েন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে  এখনই অতি সতর্কতার প্রয়োজন নেই: ইইউ ইরান ভেনেজুয়েলা নয়: ট্রাম্পের জন্য সহজ নয় জয়ের পথ গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে তারেক রহমান, মানবিক আবেগে ভরা মতবিনিময় সভা খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল: ডা. এফ এম সিদ্দিকীর গুরুতর অভিযোগ কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ: রংপুরে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমাবেশ ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস: ঋণ-বিবাদে নৃশংসভাবে খুন মা ও কিশোরী মেয়ে

খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় নিচ্ছেন আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০৬:০৯:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ৭৭ বার পড়া হয়েছে

বেগম খালেদা জিয়াকে কৃষক সমাজ  শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দৃঢ় কণ্ঠের  নীরবতা, খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন আপসহীন নেত্রী ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ‘বিভেদ নয়, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস’, এই দর্শনকে ধারণ করেই চার দশকেরও বেশি সময় তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষে মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। কিডনি, হৃদরোগ ও নিউমোনিয়াসহ একাধিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও শূন্যতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রাক্কালে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীর প্রয়াণে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নেমে আসে শোকের আবহ। সরকার বুধবার এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে এবং বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগ্রামী ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক বিজয় মিছিল। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ : ছবি সংগ্রহ
এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগ্রামী ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক বিজয় মিছিল। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ : ছবি সংগ্রহ

জানাজা ও দাফন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়ার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনে নেওয়া হবে। হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত প্রায় ১৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পুরো পথজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। জানাজা ও দাফন ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে বিশেষ নজরদারি ও সমন্বিত কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। সংসদ ভবন, দেশের সব দূতাবাস এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের উপস্থিতির বিষয়টি ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় খোলেদা জিয়া
জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় খোলেদা জিয়া

সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতিসংঘ গভীর শোক প্রকাশ করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরাও শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ দুটি মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনিই দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে রাজনৈতিক পরিচিতি এনে দেয়।

রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা ও দীর্ঘ কারাবাসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একই সঙ্গে বহন করতে হয়েছে ব্যক্তিগত শোক-স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পুত্র আরাফাত রহমান কোকোকে হারানোর বেদনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২ জুলাই ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে সেনানিবাসে আটক রাখা হয়।

খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছালে স্বাগত জানান ছেলে তারেক রহমান ও পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান। জানুয়ারি ২০২৫
খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছালে স্বাগত জানান ছেলে তারেক রহমান ও পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান। জানুয়ারি ২০২৫

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক জীবনে সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে উচ্ছেদের ঘটনাও তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়তা বজায় রেখে রাজনৈতিক জীবন পরিচালনা করেছেন। খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। প্রাথমিক শিক্ষা সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা দিনাজপুরে সম্পন্ন করেন।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন। তাঁর শাসনামল নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষ করে দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বিষয়ে। তবু সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও আপোষহীন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত।

২০১৮ সালে কারাবাস, পরবর্তী সময়ে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ চিকিৎসাজনিত ভোগান্তি সব মিলিয়ে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সংগ্রাম তাঁকে ছাড়েনি। অবশেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের নায়ক। তাঁর মহাপ্রয়াণ ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ করবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় নিচ্ছেন আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া

আপডেট সময় : ০৬:০৯:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দৃঢ় কণ্ঠের  নীরবতা, খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন আপসহীন নেত্রী ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ‘বিভেদ নয়, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের রাজনীতিতে বিশ্বাস’, এই দর্শনকে ধারণ করেই চার দশকেরও বেশি সময় তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষে মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। কিডনি, হৃদরোগ ও নিউমোনিয়াসহ একাধিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও শূন্যতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রাক্কালে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীর প্রয়াণে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নেমে আসে শোকের আবহ। সরকার বুধবার এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে এবং বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগ্রামী ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক বিজয় মিছিল। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ : ছবি সংগ্রহ
এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগ্রামী ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক বিজয় মিছিল। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ : ছবি সংগ্রহ

জানাজা ও দাফন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়ার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনে নেওয়া হবে। হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত প্রায় ১৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পুরো পথজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। জানাজা ও দাফন ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে বিশেষ নজরদারি ও সমন্বিত কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। সংসদ ভবন, দেশের সব দূতাবাস এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের উপস্থিতির বিষয়টি ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় খোলেদা জিয়া
জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় খোলেদা জিয়া

সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতিসংঘ গভীর শোক প্রকাশ করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরাও শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ দুটি মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনিই দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে রাজনৈতিক পরিচিতি এনে দেয়।

রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা ও দীর্ঘ কারাবাসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একই সঙ্গে বহন করতে হয়েছে ব্যক্তিগত শোক-স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পুত্র আরাফাত রহমান কোকোকে হারানোর বেদনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২ জুলাই ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে সেনানিবাসে আটক রাখা হয়।

খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছালে স্বাগত জানান ছেলে তারেক রহমান ও পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান। জানুয়ারি ২০২৫
খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছালে স্বাগত জানান ছেলে তারেক রহমান ও পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান। জানুয়ারি ২০২৫

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক জীবনে সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে উচ্ছেদের ঘটনাও তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়তা বজায় রেখে রাজনৈতিক জীবন পরিচালনা করেছেন। খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। প্রাথমিক শিক্ষা সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা দিনাজপুরে সম্পন্ন করেন।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন। তাঁর শাসনামল নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষ করে দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বিষয়ে। তবু সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও আপোষহীন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত।

২০১৮ সালে কারাবাস, পরবর্তী সময়ে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ চিকিৎসাজনিত ভোগান্তি সব মিলিয়ে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সংগ্রাম তাঁকে ছাড়েনি। অবশেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের নায়ক। তাঁর মহাপ্রয়াণ ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ করবে।