অলৌকিক নয়, লৌকিক
- আপডেট সময় : ১০:১৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২১ ৪৫৫ বার পড়া হয়েছে
ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ
‘সৌর কার্তিক মাসের এই ব্রত পালন শুরু হয় মাটির প্রদীপ গড়ার মাধ্যমে। এই প্রদীপ আসলে দেহেরই প্রতীক। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম-এই পঞ্চভূতে যেমন তৈরি হয় এই নশ্বর শরীর, মাটির প্রদীপটিও তাই! ক্ষিতি বা মাটি তার কায়া তৈরি করে। অপ বা জলে তা আকার পায়। তেজ বা আগুন আত্মার মতোই স্থিত হয় তার অন্তরে। মরুৎ বা হাওয়া সেই আগুনকে জ্বলতে সাহায্য করে। আর ব্যোম বা অনন্ত শূন্য জেগে থাকে তার গর্ভে’

ঋতু হেমন্ত, মাস আশ্বিন, সংক্রান্তি। চাপা গরম থেকে হঠাৎ স্বস্তি বিলিয়ে হাওয়ার বদল চলছে। ঝুপ করে নামছে সন্ধ্যা। সে এসে গিয়েছে। কুয়াশায় আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটু দূরে। একটা আলো দেখালে হয়তো তার আসতে সুবিধে হবে। উত্তরের জানালাটা গলিয়ে ‘ও’ আসছে।
ওই হাওয়ায় আকাশপ্রদীপগুলো ঝিকমিক করছে ধ্রুব তারার মতো। নাবিকদের পথ দেখাতো আলোর নির্দেশার মতো। চুপি চুপি শুনিয়ে যাচ্ছে জনমান্তরের গল্প। সেই সময় থেকে যখন ঋতুর নামকরণ হয়নি। অন্ধকারও তখন এই সময়ের মতো আলোকিত নয়।
শীত আসছে। একে নিভতে দেওয়া যাবে না। আকাশের আলো নিভে গিয়েছে। দূর থেকে ওরা নজর করছেন। কার্তিক মাসটা পূর্ব পুরুষের মাস। এসময় ওনারা সহজেই মর্ত্যের পথে বিচরণ করেন। ভিটের টানে ছুটে আসেন। আর এই আকাশ প্রদীপ তাঁদের ভিটে গুলি চিনে নিতে সাহায্য করে। এমনটাই শুনে আসছি বাবার কাছে সেই শৈশব থেকে।
আশ্বিনের শেষ দিনে জলবিষুব সংক্রান্তি পালনের উদ্যোগ চলছে ব্রাহ্মণ পরিবারগুলিতে। এই জলবিষুব সংক্রান্তি থেকে ষড়শীতি সংক্রান্তি বা কার্তিক মাসের শেষ দিন পর্যন্ত চলবে ব্রত-উৎসব। বিষ্ণু ভক্ত ব্রাহ্মণ্যজীবনের যা এক অবশ্য কর্তব্যও বটে। বিশেষ করে যবনী শাসনের এই কালে নিজেদের আচার-ধর্ম রক্ষায় একটু বেশিই উদ্যোগী হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণরা।

সৌর কার্তিক মাসের এই ব্রত পালন শুরু হয় মাটির প্রদীপ গড়ার মাধ্যমে। এই প্রদীপ আসলে দেহেরই প্রতীক। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম-এই পঞ্চভূতে যেমন তৈরি হয় এই নশ্বর শরীর, মাটির প্রদীপটিও তাই! ক্ষিতি বা মাটি তার কায়া তৈরি করে। অপ বা জলে তা আকার পায়। তেজ বা আগুন আত্মার মতোই স্থিত হয় তার অন্তরে। মরুৎ বা হাওয়া সেই আগুনকে জ্বলতে সাহায্য করে। আর ব্যোম বা অনন্ত শূন্য জেগে থাকে তার গর্ভে।
কার্তিক মাস ধরে এই প্রদীপ দেওয়া শুধুই বিষ্ণুর আশীর্বাদ যাচনা নয়। তাঁকে তো স্মরণ করতেই হবে। এই পৃথিবীকে পালন করেন তিনি, মৃত্যুর পরেও মানুষের উপরে রয়েছে তাঁরই অধিকার। তাই আকাশপ্রদীপ দেওয়ার সময় উচ্চারণ করা হয় মন্ত্র-‘আকাশে সলক্ষ্মীক বিষ্ণোস্তোষার্থং দীয়মানে প্রদীপঃ শাকব তৎ।’ আকাশে লক্ষ্মীর সঙ্গে অবস্থান করছেন যে বিষ্ণু, তাঁর উদ্দেশে দেওয়া হল এই প্রদীপ। এ বাদেও আকাশপ্রদীপ শীতঋতুতে মানুষের অগ্নিসঞ্চয়ের অভ্যাস।

তার জন্য যজ্ঞের উপযোগী বৃহৎ কাঠের এক পুরুষপ্রমাণ দণ্ড নির্মাণ করা হয়। তাতে যবাঙ্গুল পরিমাণ ছিদ্র করে লাগানো হয় দু’হাত পরিমাণ রক্তবর্ণের পট্টি। সেই অষ্টকোণযুক্ত পট্টির ভিতরে রাখা হয় এই দেহের প্রতীক প্রদীপটি। স্থাপনের সময় বলা হয়-‘দামোদরায় নভসি তুলায়াং লোলয় সহ/প্রদীপং তে প্রযচ্ছামি নমোহনস্তায় বেধসে।’ কার্ত্তিকমাসে লক্ষ্মীর সঙ্গে দামোদরকে আমি আকাশে এই প্রদীপ দিচ্ছি। বেধ অনন্তকে নমস্কার।
অনেক ব্রাহ্মণ পরিবার আকাশপ্রদীপ স্থাপনের সময় উচ্চারণ করেন- ‘নিবেদ্য ধৰ্ম্মার হরায় ভূম্যৈ দামোদরায়াপ্যথ ধৰ্ম্মরাজে/প্রজাপতিভ্যত্বথ সৎপিতৃভ্যঃ প্রেতেভ্য এবাথ তমঃ স্থিতেভ্যঃ।’ তাঁরা শুধুই আকাশপ্রদীপটি লক্ষ্মী-নারায়ণকে নিবেদন করেন না। তার সঙ্গে আবাহন করেন পিতৃলোকে, প্রেতলোকে থিতু হওয়া পূর্বপুরুষদেরও। যাতে তাঁরা সেই আলোয় পথ চিনে আশীর্বাদ দিতে আসতে পারেন উত্তরসূরীদের।
টিম টিম করে জ্বলতে জ্বলতে এতক্ষন এটাই বলছিলো আকাশপ্রদীপ। হিমের সঙ্গে নিস্তব্ধতা নেমে আসতে থাকে শহরের রাতে। প্রদীপ চুপ করে যায়। শহরের ব্যস্ততায় কোথাও সে যেন গা ঢাকা দিয়েছে।
আর মাত্র তিন দিন পর ধনত্রয়োদশীর পরদিনই পালিত হবে ভূত চতুর্দশী। একে আবার ভারতের নানান প্রান্তে নানা নাম দেওয়া হয়। নরক চতুর্দশী, রূপ চতুর্দশীও বলা হয়। তবে এই ভূত চতুর্দশী বলতে ভূত-প্রেত বোঝায় না, বরং পূর্বপুরুষদের বোঝায়। এই দিনটি চোদ্দো পুরুষকে উৎসর্গ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ভূত চতুর্দশীর দিনে ১৪ শাক খাওয়ার ও ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা রয়েছে। এদিন আবার অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে যমের প্রদীপ জ্বালিয়ে বাড়ি থেকে বার করা হয়।
পুরাণ অনুযায়ী এদিন কিছু ক্ষণের জন্য স্বর্গ ও নরকের দ্বার খোলা থাকে। এ সময় বিদেহী আত্মা ও স্বর্গত আত্মারা মর্ত্যে নেমে আসেন। এ সময় ভূত-প্রেত নিয়ে মর্ত্যে আসেন রাজা বলি।

রাজা বলির মর্ত্যে আগমনের কারণ সম্পর্কে বিষ্ণু পুরাণে উল্লেখ পাওয়া যায়। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর ছিলেন রাজা বলি। শিবভক্ত দৈত্য রাজা বলি বিষ্ণুর আরাধনা করতেন না। বলির পরাক্রমে অতিষ্ট দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। দেবতাদের বলির পরাক্রম থেকে মুক্ত করতে বামন অবতারে তাঁর সামনে উপস্থিত হন বিষ্ণু। বলির কাছ থেকে তিন পদ জমি চেয়ে বসেন বামন বেশে আসা বিষ্ণু। বিষ্ণু নিজের এক পা রাখেন স্বর্গে এবং অপর পা রাখেন মর্ত্যের ওপর। তাঁর নাভি থেকে তৃতীয় পা বেরিয়ে এলে, তা রাখার জন্য বলি নিজের মাথা এগিয়ে দেন। এর ফলে ক্রমশ পাতালে প্রবেশ ঘটে দৈত্যরাজ বলির।
উল্লেখ্য, রাজা বলি সপ্ত চিরজীবীর মধ্যে একজন। বলির দানবীর স্বভাবে প্রসন্ন হয়ে বিষ্ণু তাঁদের আশীর্বাদ দেন যে, তাঁর ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা পৃথিবীতে পুজো পাবে। ভূত চতুর্দশীর দিনে বলি ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা পুজো নিতে পৃথিবীতে আসেন।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এদিন ওল, কেও, বেতো কালকাসুন্দা, নিম, সরষে শালিঞ্চা বা শাঞ্চে, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু বা ভাঁট, হিঞ্চে, শুষনি, শেলু শাক খাওয়া হয় এদিন। এই সমস্ত শাক মিশিয়ে এক পদ রান্না করা হয়। তবে আয়ুর্বেদে যে ১৪ শাকের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা হল পালং শাক, লাল শাক, শুষনি, পাট শাক, ধনে, পুঁই, কুমড়ো, গিমে, মূলো, কলমি, সরষে, নোটে, মেথি, লাউ বা হিঞ্চে। আয়ুর্বেদ মতে এই ১৪টি শাকে নানান রোগ নাশক শক্তি বর্তমান। এই শাকগুলি ঋতু পরিবর্তনের সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

লোকাচার মতে, কালীপুজোর আগের দিন ১৪ শাক খেতে হয়। এর পাশাপাশি জ্বালাতে হয় ১৪ প্রদীপ। মনে করা হয় ১৪ শাক খেয়ে সন্ধেবেলা ১৪ প্রদীপ জ্বালালে দূরাত্মা ও অন্ধকার দূর হয়।আবার অশুভ আত্মাদের হাত থেকে বাঁচতে ভূত চতুর্দশীর দিনে যে মন্ত্র জপ করা হয়, তা হল ‘শীতলঞ্চ সমাযুক্ত সকণ্টক দলান্বিত। হরপাপ সপামার্গে ভ্রাম্যমাণঃ পুনঃ পুনঃ’। এই মন্ত্র পাঠের ফলে অশুভ আত্মার ভয় কেটে যায়।
ভূত চতুর্দশীর রাতে শিবভক্ত রাজা বলি ও তাঁর অনুচরেরা মর্ত্যে পুজো নিতে আসেন। চতুর্দশী তিথির ভরা অমাবস্যার অন্ধকারে রাজা বলি ও তাঁর অনুচরেরা যাতে পথভ্রষ্ট বাড়িতে ঢুকে না-পড়েন, তাই পথ দেখানোর উদ্দেশে এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। অন্য একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের সময় পিতৃপুরুষদের মর্ত্যে আগমন হয়। তার পর এই চতুর্দশী তিথিতেই শুরু হয় তাঁদের ফেরার পালা। সে সময় অন্ধকারে পথ দেখানোর জন্য ১৪ প্রদীপ জ্বালানো হয়।
এই চতুর্দশীকে আবার যম চতুর্দশীও বলা হয়। এদিন ১৪ জন যমের উদ্দেশে তর্পণের রীতি প্রচলিত আছে। মহালয়ায় পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করা হলেও যমদের উদ্দেশে তর্পণ করা হয় না। তাই চতুর্দশী তিথিতে এই তর্পণ করা হয়ে থাকে। এই ১৪ জন যমরাজ হলেন, ধর্মরাজ, মৃত্যু, অন্তক, বৈবস্বত, কাল, সর্বভূতক্ষয়, যম, উড়ুম্বর, দধ্ন, নীন, পরমেষ্ঠী, বৃকোদর, চিত্র ও চিত্রগুপ্ত। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী এই তিথিতে গঙ্গা স্নান করলে নরক দর্শনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

পশ্চিমের দেশ গুলিতে পালিত ‘হ্যালোইন’ বা ‘অল্ হ্যালোজ্ ইভ্’ হলো খ্রিস্টধর্মের একটি বার্ষিক উৎসব যা প্রাথমিকভাবে কেলটিক ফসল কাটার উৎসব দ্বারা প্রভাবিত। অন্যান্য পণ্ডিতদের মতে, এই উৎসবটির স্বতন্ত্র উৎপত্তি সামহেন থেকে এবং এর মূলে সরাসরি খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বিদ্যমান।
হ্যালোইন উৎসবে পালিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে ট্রিক-অর-ট্রিট, বনফায়ার বা অগ্ন্যুৎসব, আজব পোষাকের পার্টি, ভৌতিক স্থান ভ্রমণ, ভয়ের চলচ্চিত্র দেখা ইত্যাদি। আইরিশ-স্কটিশ অভিবাসীরা ১৯শ শতকে এই ঐতিহ্য উত্তর আমেরিকাতে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলিও হ্যালোইন উদ্যাপন করা শুরু করে। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকগুলি দেশে হ্যালোইন পালিত হয়, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, পুয়ের্তো রিকো, এবং যুক্তরাজ্য। এছাড়া এশিয়ার জাপানে এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও হ্যালোইন পালিত হয়।
এখনকার হ্যালোইন এর রীতিনীতি কেল্টিক ভাষী দেশগুলোর লোকজ রীতিনীতি ও বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত বলে ধারণা করা হয়; হ্যালোইন বা হ্যালোউইন শব্দটি এসেছে স্কটিশ শব্দ অল হ্যালোজ ইভ থেকে। হ্যালোইন শব্দের উৎপত্তি ১৭৪৫ সালের দিকে। হ্যালোউইন শব্দের অর্থ পবিত্র সন্ধ্যা।
এই রাতটি উদযাপন করতে সেখানে মাসজুড়ে প্রস্তুতি চলে, পুরো অক্টোবর মাস ধরে চলে আয়োজনের ঘনঘটা। কুমড়োর লণ্ঠন তৈরি, বাড়িঘর-রাজপথ সাজানো ও চকলেট-পেস্ট্রি তৈরিতে ব্যস্ত থাকে আয়োজকরা। সেসব দেশের কয়েকটি প্যাগান বা পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বি আর অন্যান্যগুলো কেলটিক খ্রিস্টধর্ম অবলম্বন করে থাকে। জ্যাক স্যানটিনো, একজন লোকচারবাদি, লিখেছেন “উত্তর আয়ারল্যান্ডে পবিত্রতা ও ধর্ম হলো হ্যালোইনকে বোঝার মৌলিক প্রসঙ্গ, কিন্তু

এই উৎসব উৎযাপন নিয়ে আয়ারল্যান্ডের সর্বত্র একটি অস্বস্তিকর সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় খ্রিস্টধর্মের রীতিনীতি ও বিশ্বাস এবং পুর্বে আয়ারল্যান্ডে যেসব ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ছিলো তাদের মধ্যে। ইতিহাসবিদ নিকোলাস রজার্স হ্যালোইন এর মূল উৎসের অনুসন্ধান করার সময় লক্ষ্য করেন, কিছু লোকাচারবাদি হ্যালোইন এর উৎস খুজে পেয়েছিলেন ফল ও বীজের দেবীকে উৎসর্গীকৃত পোমোনার রোমান ভোজোৎসবে, অথবা মৃতদের উৎসব প্যারেন্টালিয়াতে; এবং এই উৎসবগুলো সাধারনত কেল্টিকদের সামহেন উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত।
আইরিশ, যুক্তরাজ্য, ওয়েলশ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিশ্বাস করতো যে প্রত্যেক নতুন বছরের আগের রাতে (৩১শে অক্টোবর) সাহেইন, মৃত্যুর দেবতা, আঁধারের রাজ পুত্র, সব মৃত আত্মা ডাক দেয়। এই দিন মহাশূন্য এবং সময়ের সমস্ত আইনকানুন মনে হয় স্থগিত করা হয় এবং জীবিতদের বিশ্ব যোগদান করতে মৃত আত্মাদের অনুমোদন করে। একটি লোককাহিনী থেকে বর্ণিত আছে যে সমস্ত মৃত ব্যক্তিরা ৩১শে অক্টোবর রাত্রিতে জীবিতদের বিশ্বে আসে আগামী বছরের নতুন দেহ

নেওয়ার জন্য। এজন্য গ্রামবাসীরা এই খারাপ আত্মাদের থেকে বাচাঁর জন্য ব্যবস্থা নেয়। এই প্রথাটি ছিল পবিত্র বেদি আগুন বন্ধ করা এবং নতুন আগুন জ্বালানো হতো ( যেটি নতুন বছরের আগমন প্রতীক হিসাবে ছিল) পরবর্তী প্রভাতে। আইরিশ, যুক্তরাজ্যবাসী কেল্টদিগের পরোহিতরা তারা মিলিত হতো একটি অন্ধকার ওক (পবিত্র গাছ হিসেবে বিবেচনা করা হতো) বনের ছোট
পাহাড়ে নতুন আগুন জ্বালানোর জন্য এবং বীজ ও প্রাণী উৎসর্গ করতো। আগু্নরে চারিদিকে নাচতো এবং গাইতো প্রভাত পর্যন্ত, পথ অনুমোদন করেতো সৌর বছর এবং আঁধার ঋতু মধ্যে। যখন প্রভাত হয়, আইরিশ, যুক্তরাজ্যবাসী কেল্টদিগের পরোহিতরা প্রতি পরিবার থেকে জ্বলানো অগ্নির কয়লা অঙ্গে লাগাতো।
ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রচণ্ড জনপ্রিয় হ্যালোউইন উৎসব এখন আমাদের দেশেও অনেক জায়গাতেই পালিত হয়। প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর মৃত আত্মাদের স্মরণে হ্যালোউইন পালিত হয়। এখন জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা ভারত-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হ্যালোউইন পালিত হয়। ১৯ শতকের দ্বিতীয় ভাগে আমেরিকায় জাতীয়ভাবে হ্যালোইন ডে পালিত হতে থাকে।
১৯২০ থেকে ১৯৫০ সালের ভেতর পুরো আমেরিকায় হ্যালোইন ডে-র আনুষ্ঠানিকতা বাড়তে থাকে। পরে দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। ছোট ছোট বাচ্চারা এদিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে দরজায় কড়া নেড়ে বলে ‘ট্রিক অর ট্রিট’। তখন সেই বাড়ির থেকে বাচ্চাদের ঝুলিতে কিছু ক্যান্ডি বা খাবার-দাবার দিয়ে দেওয়া হয়।

হ্যালোইন নিয়ে প্রচলিত একটি বিখ্যাত রচনার অনুবাদ-
“The Night of Halloween”
——-Gergana Teofilova
‘হ্যালোইনের রাত্রি’
ডাইনি এবং ভূত, ভীতিকর প্রাণী,
কালো বিড়াল নীরবে গাছের আড়ালে লুকিয়ে আছে, অশুভ বৈশিষ্ট্য সহ অনেক কুমড়া,
তাদের জ্বলন্ত চোখ তোমার হাঁটু পোড়াচ্ছে
এটি একটি আতঙ্ক ও আতঙ্কের রাত,
তৃষ্ণার্ত ভ্যাম্পায়াররা নির্দোষ রক্তে ভোজ করে,
বাচ্চারা… খেয়াল রেখো, কোনো ভুল করবে না,
সেই কাকের থাবার মতন কাদায় স্ফীত হয়ে ঘোরাফেরা করে
আকাশের চাঁদ পূর্ণ, উজ্জ্বল এবং হাসিখুশি,
তার মজা ঢাকার জন্য কোন মেঘ নেই,
লক্ষ তারারা আলতো করে বিভ্রান্ত করে,
‘তোমার সাহস থাকলে আমাদের সাথে যোগ দাও, দেখান কিন্তু দৌড়াবে না! ‘
আজ রাতে বিশ্বের মধ্যে সংযোগ ঠিক আছে,
মৃতদের আত্মা জীবনের জন্য অতিক্রম করে,
পুরানো, প্রাচীন কাল থেকে এমনই হয়ে আসছে,
দেবতাদের দ্বারা উদ্ভাবিত একটি ঐতিহ্য, রয়েছে সংগ্রাম করে
লোকেরা দানব এবং মমি হিসাবে সাজে,
দেখানোর চেষ্টা করে তারা অন্ধকারকে ভয় পায় না,
তারা ডামি ছাড়া কিছুই নয়,সেটা তারা বোঝে না
একটি একক ভুল পদক্ষেপ এবং তারা কেবল কঠোর থেকে কঠোরতায়
সেখানকার ছায়াগুলো উদ্ভাসিত হওয়ার জন্য অপেক্ষায়,
তাদের অশুভ আর্তনাদ নির্মমভাবে হাড় ঠাণ্ডা করে দেয়
‘বাইরে এসো এবং কেবল শয়তানের সাথে নাচ! …
অথবা তুমি দেখতে অক্ষম হবে তোমার জাগতিক পাপের প্রায়শ্চিত্ত !
অল হ্যালোস ইভ অন্য কারো মত নয়,
নেই এখানে স্বর্গ নরকের উপর জয়লাভ করার চেষ্টায়
রাক্ষস আর ফেরেশতা ভাইয়ের মত হেঁটে যায়
যেন কেউ রেখেছে তাদের মন্ত্রের আওতায়
ক্যান্ডি দিয়ে তাদের যাবেনা আটকে রাখা
তারা জ্বলতে থাকে, এইভাবে অন্ধকারকে চকচকে পরিণত করে,
যখন সকাল হবে তখন একটা রাস্তাও যাবে না দেখা
কিন্তু কিছু মনে কর না হ্যালোইনের রাত উপভোগ করতে ভুল না..

অদ্ভূত ভাবে এই সমস্ত অলৌকিক ঘটনাকে কালক্রমে আমরা লৌকিক রূপ প্রদান করেছি।আসলে কোথাও আমরা মিশতে চাই আমাদের স্বত্ত্বার সাথে আমাদের অতীত কে কানো যেন ধরে রাখতে চাই।কল্পনার আলোকে চেতনাকে উদ্ভাসিত করে আমরা অলৌকিক কে লৌকিক রূপ প্রদান করি যার মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকেন আমাদের শেকড় আমাদের আদি পুরুষ।কিছু ভয় কিছু ভালোবাসায় আমরা তাঁদের স্বরণ করি প্রতি বছর। অলৌকিক ঘটনা অচিরেই লৌকিক আচারে রূপান্তরিত হয়।
(ড. বিরাজলক্ষী ঘোষ : শিক্ষাবিদ, লেখক, পরিবেশ সংগঠক ও সামাজচিন্তক)
























