মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরছেন দেবী দুর্গা, প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো ৫দিনের উৎসব
- আপডেট সময় : ০৫:২৯:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর ২০২৫ ৯৬ বার পড়া হয়েছে
শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হলো বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব শেষে বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে দেবী দুর্গাকে সাড়ম্বরে বিদায় জানানো হচ্ছে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বিকেল ৪টায় বের হয় কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা, যেখানে শতাধিক প্রতিমা ও হাজারো ভক্ত অংশ নেন। পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ঢাকার অধিকাংশ পূজামণ্ডপের প্রতিমা জমা হয় পলাশী মোড়ে।
ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রা বের হওয়ার সময় শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাক-ঢোলের বাদ্য ও দেবী বন্দনার সুরে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ ভক্তরা ভক্তিমাখা চোখে দেবীর বিদায়যাত্রায় শামিল হন। সজ্জিত গাড়িতে প্রতিমা বহন করা হয়, আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সোয়ারিঘাটে গিয়ে শেষ হয় শোভাযাত্রা, সেখান থেকেই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় বুড়িগঙ্গায়।
এ বছর ঢাকায় ২৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে ১৬৯টি এবং উত্তর সিটিতে বাকিগুলো। তবে বিজয়া শোভাযাত্রায় মূলত দক্ষিণ সিটির মণ্ডপগুলো অংশ নেয়।

দেবী বিসর্জনের আগে সকাল থেকেই পূজামণ্ডপগুলোতে শুরু হয় সিঁদুর খেলার উৎসব। বাঙালি হিন্দু নারীরা দেবীর কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে নিজেদের কপালে ও একে অপরের মুখে মেখে দেন শুভলক্ষণ হিসেবে। বিশ্বাস করা হয়, এ প্রথা স্বামীদের দীর্ঘায়ু ও পারিবারিক সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
সিঁদুর খেলার ইতিহাস প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো। বিজয়া দশমীতে এ খেলার পাশাপাশি ধুনুচি নাচেরও প্রথা রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ধুনুচি নাচ দেবীকে তুষ্ট করে এবং তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়। উৎসবের ভেতর দিয়েই ভক্তরা প্রার্থনা করেন যেন দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়ে পৃথিবী শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে।
সনাতন ধর্মমতে, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা কৈলাসে স্বামী মহাদেবের কাছে ফিরে যান। ভক্তদের বিশ্বাস, এক বছর পর আবার শরতের আকাশে দেবী আগমন করবেন পৃথিবীতে। এ বছর পঞ্জিকা অনুযায়ী দেবী গজে (হাতি) চড়ে মর্ত্যে আগমন করেছেন, যা সমৃদ্ধি ও শস্যপূর্ণার প্রতীক। তবে তিনি বিদায় নিচ্ছেন পালকিতে, যা ধর্মীয় বিশ্বাসে দুর্যোগ, রোগব্যাধি ও মহামারির আশঙ্কার ইঙ্গিত বহন করে।

শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, সারাদেশের প্রতিটি মণ্ডপেই আজ বিসর্জনের আয়োজন চলছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাবে, এ বছর সারাদেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার বেশি। প্রতিটি জেলায় বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রা শেষে নদী বা জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে দুর্গোৎসবের।
ষষ্ঠীর সকালে আনন্দময়ীর বন্দনায় যে পূজার সূচনা হয়েছিল, তা শেষ হলো দশমীর বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। ভক্তদের চোখে আনন্দ ও অশ্রুভেজা বিদায় মিশ্রিত আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাক-ঢোলের তালে, শঙ্খনাদের শব্দে দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকেই বলেন, “আবার এসো মা, আগামী শরতে।”
দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। বিজয়া দশমীর বিসর্জনে শেষ হলেও ভক্তদের হৃদয়ে দেবীর উপস্থিতি অম্লান থাকে সারাবছর। দেবী কৈলাসে ফিরে গেলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আগাম শরতের নতুন পূজার আশায় আবারও অপেক্ষা শুরু করেছেন।




















