ঢাকা ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শার্শায় র‌্যাবের অভিযানে ২৯৭০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক খুব শিগগিরই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে-চীনা রাষ্ট্রদূত তৈরি পোশাকখাত এখন পোশাক খাত এখন আইসিইউতে: মোহাম্মদ হাতেম তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ ব্যবসা মন্দা, আয় সংকোচন ও রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি  নির্বাচন কমিশনের সামনে বিজিবি মোতায়েন, ছাত্রদলের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত মাদারীপুরে বাস অটোরিকশা সংঘর্ষ প্রাণ গেল ৬জনের বাংলাদেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ব্যাখ্যা দিল অন্তর্বর্তী সরকার রমজান সামনে আগেই চড়া বাজার: দামে লাগাম টানতে কড়া নজরদাবি জরুরি বেনাপোল বন্দরে আমদানি-রফতানি ও এপার-ওপার যাতায়তে আয়

বাংলাদেশের বন্দর খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৫:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫ ২১৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বন্দর খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প শুধু একটি বন্দর উন্নয়ন নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশের বন্দর খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ডেনমার্কভিত্তিক মায়ের্সক গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বি.ভি.-এর সঙ্গে ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের পথে রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মাধ্যমে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) নির্মাণ ও পরিচালনা করা হবে।

বুধবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পটি বাংলাদেশের বন্দর খাতকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। এটি কেবল একটি অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়, বরং দেশের লজিস্টিকস খাতকে ফিউচার-রেডি করে তুলবে—যা রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বিনিয়োগে নতুন যুগের সূচনা করবে।

এপিএম টার্মিনালস বি.ভি. সম্পূর্ণরূপে মায়ের্সক গ্রুপের মালিকানাধীন। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর ইউরোপের শীর্ষ দেশ ডেনমার্কে, যা বিশ্বে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে (২০২৪), এপিএম বর্তমানে ৩৩টি দেশে ৬০টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে এবং বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বন্দরের মধ্যে ১০টির অপারেটর। চীন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে বিশ্বমানের প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আসবে।

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল হবে বাংলাদেশের প্রথম গ্রীন ও স্মার্ট পোর্ট, যা বর্তমান সক্ষমতার দ্বিগুণ আকারের জাহাজ ধারণে সক্ষম হবে। এতে থাকবে ২৪ ঘণ্টা নাইট ন্যাভিগেশন সুবিধা। ফলে বাংলাদেশের শিপিং সংযোগ বিশ্ববাজারে আরও দৃঢ় হবে এবং রপ্তানি-আমদানির পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

চুক্তির আওতায় এপিএম টার্মিনালস ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে, যা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এককভাবে সর্ববৃহৎ ইউরোপীয় ইক্যুইটি বিনিয়োগ। এর ফলে শুধু বন্দর খাতই নয়, অন্যান্য খাতেও বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়বে। প্রকল্পটি চালু হলে বন্দরটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৮ লক্ষাধিক টিইইউ বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪৪% বেশি। টার্মিনালটি ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই প্রকল্প রাজস্ব ভাগাভাগি ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতি কনটেইনারে নির্দিষ্ট ডলারে রাজস্ব পাবে। কর, শুল্ক ও সামুদ্রিক সেবার মাধ্যমে সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে ৫০০–৭০০ জনের সরাসরি এবং হাজারো পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এপিএম টার্মিনালস বিশ্বমানের হেলথ, সেফটি, সিকিউরিটি ও এনভায়রনমেন্ট নীতিমালা অনুসরণ করবে। উন্নত ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, LEAN পদ্ধতি ও FLOW প্রসেস ফ্রেমওয়ার্ক বাংলাদেশের বন্দর পরিচালনা আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলবে।

দ্রুত জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থার ফলে রপ্তানিকারকরা, বিশেষ করে পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত ও হালকা প্রকৌশল খাতের উদ্যোক্তারা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

এপিএম টার্মিনালসের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবস্থাপকরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পাবেন। এতে দেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার ও জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগের ফলে বন্দরটির কার্বন নির্গমন কমবে, যা প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে।

এই দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি বাংলাদেশের পিপিপি খাতের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বাংলাদেশের বন্দর খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে

আপডেট সময় : ০৫:৩৫:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প শুধু একটি বন্দর উন্নয়ন নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশের বন্দর খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ডেনমার্কভিত্তিক মায়ের্সক গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বি.ভি.-এর সঙ্গে ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের পথে রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মাধ্যমে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) নির্মাণ ও পরিচালনা করা হবে।

বুধবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পটি বাংলাদেশের বন্দর খাতকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। এটি কেবল একটি অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়, বরং দেশের লজিস্টিকস খাতকে ফিউচার-রেডি করে তুলবে—যা রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বিনিয়োগে নতুন যুগের সূচনা করবে।

এপিএম টার্মিনালস বি.ভি. সম্পূর্ণরূপে মায়ের্সক গ্রুপের মালিকানাধীন। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর ইউরোপের শীর্ষ দেশ ডেনমার্কে, যা বিশ্বে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে (২০২৪), এপিএম বর্তমানে ৩৩টি দেশে ৬০টিরও বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে এবং বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বন্দরের মধ্যে ১০টির অপারেটর। চীন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে বিশ্বমানের প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে আসবে।

লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল হবে বাংলাদেশের প্রথম গ্রীন ও স্মার্ট পোর্ট, যা বর্তমান সক্ষমতার দ্বিগুণ আকারের জাহাজ ধারণে সক্ষম হবে। এতে থাকবে ২৪ ঘণ্টা নাইট ন্যাভিগেশন সুবিধা। ফলে বাংলাদেশের শিপিং সংযোগ বিশ্ববাজারে আরও দৃঢ় হবে এবং রপ্তানি-আমদানির পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

চুক্তির আওতায় এপিএম টার্মিনালস ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে, যা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এককভাবে সর্ববৃহৎ ইউরোপীয় ইক্যুইটি বিনিয়োগ। এর ফলে শুধু বন্দর খাতই নয়, অন্যান্য খাতেও বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়বে। প্রকল্পটি চালু হলে বন্দরটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৮ লক্ষাধিক টিইইউ বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪৪% বেশি। টার্মিনালটি ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই প্রকল্প রাজস্ব ভাগাভাগি ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতি কনটেইনারে নির্দিষ্ট ডলারে রাজস্ব পাবে। কর, শুল্ক ও সামুদ্রিক সেবার মাধ্যমে সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। নির্মাণ ও পরিচালনা পর্যায়ে ৫০০–৭০০ জনের সরাসরি এবং হাজারো পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এপিএম টার্মিনালস বিশ্বমানের হেলথ, সেফটি, সিকিউরিটি ও এনভায়রনমেন্ট নীতিমালা অনুসরণ করবে। উন্নত ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, LEAN পদ্ধতি ও FLOW প্রসেস ফ্রেমওয়ার্ক বাংলাদেশের বন্দর পরিচালনা আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলবে।

দ্রুত জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থার ফলে রপ্তানিকারকরা, বিশেষ করে পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত ও হালকা প্রকৌশল খাতের উদ্যোক্তারা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

এপিএম টার্মিনালসের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবস্থাপকরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পাবেন। এতে দেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার ও জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগের ফলে বন্দরটির কার্বন নির্গমন কমবে, যা প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে।

এই দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি বাংলাদেশের পিপিপি খাতের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে বলে আশা করা হচ্ছে।