মেঘনার বুকে জেগে ওঠা স্বপ্ন, লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন ঠিকানা
- আপডেট সময় : ০৪:৪২:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত মেঘনা অববাহিকার চরাঞ্চল, বিশেষ করে ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং হাতিয়া, আজও পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়নি এমন এক বিশাল সম্ভাবনার ভাণ্ডার। পলিমাটি সমৃদ্ধ এই চরগুলোতে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে কৃষি, পশুপালন ও বনায়নের মাধ্যমে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘনা নদীর চরগুলোতে নতুন ও পুরাতন ভূমির মিশ্রণ রয়েছে, যা কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। উর্বর পলিমাটিতে ধান, খেসারি, মসুর, চিনাবাদাম, সয়াবিন, মরিচ ও নানা ধরনের শাকসবজি চাষ করে বাম্পার ফলন সম্ভব। বিশেষ করে শীত মৌসুমে রবিশস্য উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারেন।

একই সঙ্গে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা সম্ভব, যেখানে নারীদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চরের বিস্তীর্ণ ঘাসভূমি বহুমুখী কৃষি ও পশুপালনের জন্য উপযোগী। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সাগরের নোনাজল থেকে জমি রক্ষায় রিং বাঁধসহ টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে বছরজুড়ে তরমুজ, সবজি, পেঁয়াজ, আলু ও কাঁচামরিচের মতো উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফারাজী মনে করেন, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-যুবক যারা প্রতিবছর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, তাদের এই চরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে দেশের অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি পরিবারগুলোও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘মাটির প্রতি ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে পারলেই এই চরের মাটিই বদলে দিতে পারে মানুষের ভাগ্য।’
ঐতিহাসিকভাবে ভোলা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপজেলা, যা মেঘনা নদী ও তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত। দ্বীপটির সৃষ্টি শুরু হয় প্রায় ১৩শ শতকে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কৃষিনির্ভর জনপদে পরিণত হয়। বর্তমানে ভোলার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য চর, যেমন চর কুকরি-মুকরি, চর মনপুরা, চর জহিরউদ্দীনসহ আরও অনেক দ্বীপ, যা এই জেলার ভূ-প্রকৃতিকে করেছে অনন্য।

উপকূলীয় এই অঞ্চলগুলোর ভূ-প্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় একদিকে যেমন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে, অন্যদিকে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কৃষি অবকাঠামো, সেচব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণ সুবিধা উন্নত করা গেলে চরাঞ্চলের অর্থনীতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশন একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে কয়েক লাখ হেক্টর পতিত চর জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাজারো বেকার তরুণের হাতে কাজ তুলে দেওয়া সম্ভব হবে এবং তারা হয়ে উঠবে দেশের উৎপাদনশীল শক্তি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উপকূলীয় এই চরাঞ্চলগুলো দেশের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এই চরগুলোই একদিন বদলে দিতে পারে উপকূলের মানুষের জীবনচিত্র, দারিদ্র্য পেরিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার এক নতুন গল্প রচনা করে।



















