দু’মাসে দ্বিগুণ মব সন্ত্রাসে মৃত্যু: আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ১১:১৭:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে বেড়েছে অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার, কারা হেফাজতে মৃত্যু ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও। এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি মাসে সারা দেশে মব বা গণপিটুনির ২৮টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন। অথচ আগের মাস ডিসেম্বরে ২৪টি ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ১০। এমএসএফ মনে করে, গণপিটুনিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধ এবং কার্যত বিচারবহির্ভূত হত্যার শামিল। এর পাশাপাশি জানুয়ারি মাসে ৫৭টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৪৮টি। এমএসএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বাড়া সমাজে সহিংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর চিত্রও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ডিসেম্বরে যেখানে ৯ জন বন্দি কারাগারে মারা যান, জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। এমএসএফ বলছে, এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, হেফাজতে নির্যাতন এখনো একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও মামলার পরিসংখ্যানও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত মামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা ডিসেম্বরে ১৬ থেকে জানুয়ারিতে ৮-এ নেমে এলেও, সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে ৩২০-এ পৌঁছেছে।
এমএসএফ মনে করে, এই চিত্র আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতায় জানুয়ারিতে আহতের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা ১ থেকে বেড়ে ৪ হয়েছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জানুয়ারিতে প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ভাঙচুর ও মামলাসহ এমন ঘটনা ঘটেছে ১৫টি, যেখানে ডিসেম্বরে ছিল মাত্র ৪টি। এছাড়া জানুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুটি মৃত্যু এবং গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে এমএসএফ বলছে, এসব পরিসংখ্যান একটি গভীর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকেত বহন করে, যেখানে সহিংসতা, বিচারহীনতা ও আইনের শাসনের দুর্বলতা একে অপরকে শক্তিশালী করছে। মানবাধিকার সংস্থাটি মনে করে, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
শনিবার প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্বে ঘাটতির পাশাপাশি মব সন্ত্রাস ও অজ্ঞাতনামা লাশের ঘটনা বাড়ছে, কিন্তু এসব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।









