জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা, ফের লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা
- আপডেট সময় : ০৫:৫৯:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে ফের তীব্র লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন কম হওয়ায় গরমের মৌসুমে দৈনিক ৪,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা, যার ফলে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের প্রবণতা বাড়বে। সরকার সাশ্রয়ী ব্যবহারের নির্দেশনাসহ বিদ্যুৎ খাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা যেন কাটছেই না, বরং সময়ের সঙ্গে আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দেশের ভর বোরো মৌসুম এবং ঈদের ছুটি শেষে কলকারখানা চালু, এই দুই বাস্তবতায় জ্বালানি খাতে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ, যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম পুরোদমে চলায় ডিজেলের চাহিদা দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টনে পৌঁছেছে। কৃষির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বালানির ওপর নির্ভরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বাজারেও তৈরি হয়েছে চাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, পরিবহন ও শিল্পখাতে বাড়তি জ্বালানি চাহিদা। ফলে মার্চ মাসজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক ধরনের অস্বস্তিকর ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেল-গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাকে আরও তীব্র করছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ঈদের পর শিল্প-কারখানা পুরোপুরি চালু হলে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাবে, যার ফলে লোডশেডিংও বাড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহ্বান জানালেও, বাস্তবে চাহিদা ও যোগানের ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পেট্রোল পাম্পে চাপ বাড়ার খবর মিলছে, এমনকি আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুতের প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে।
এরই মধ্যে বড় ধাক্কা এসেছে বিমান খাতে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জেট ফুয়েলের দামে লিটারপ্রতি প্রায় ৯০ টাকা বাড়িয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বেড়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা হয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক রুটেও দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আজ মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হলেও দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তিনি জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, অতিরিক্ত মজুত না করলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে, সবাই প্রয়োজনমতো তেল পাবেন।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনার জন্য এপ্রিলে ওয়াশিংটনে বৈঠক করবে সরকার। তার মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। তবে ভবিষ্যতের জন্য সবাইকে আরও সংযমী হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, সরকার ইতোমধ্যে বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অর্থায়নও চূড়ান্ত করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ যেন নিরবচ্ছিন্ন রাখা যায়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জেট ফুয়েলের এই বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিমান খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ভাড়া বাড়তে পারে, যা সাধারণ যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যয়ও বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈদেশিক ভ্রমণ ব্যয়েও। সব মিলিয়ে, জ্বালানি খাত এখন এক সংকট-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকার আশ্বস্ত করলেও, বৈশ্বিক অস্থিরতা, বাড়তি চাহিদা এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ, এই তিনের সমন্বয়ে সামনে দিনগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা পুরোপুরি কাটবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।



















