জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি এখনও তাজা, শহীদ ও আহতরা শুধু সংখ্যার অংশ নয়
- আপডেট সময় : ০১:১৬:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ ৬২ বার পড়া হয়েছে
গণঅভ্যুত্থানে শহীদ-আহতদের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময় সভায় উপস্থিত স্বজনহারাদের এভাবেই শান্তনা : ছবি সংগ্রহ
জুলাই শহীদ ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে তারেক রহমানের আবেগঘন মতবিনিময়
স্বজনরা বিশ্বাস করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের সন্তানদের হত্যার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই করা হবে
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি এখনও তাজা। শহীদ ও আহতরা শুধু সংখ্যার অংশ নয়; তারা প্রতিটি পরিবারের বুকের ভাঙা কণ্ঠ, চোখের অশ্রু, আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিঃশ্বাস। রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সেই বেদনার ঢেউ স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বসে একদিকে শুনলেন স্বজনহারাদের হৃদয়ের ব্যথা, অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি দিলেন ন্যায়বিচারের।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলের শীর্ষ নেতারা। এছাড়া তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এই রাজনৈতিক ও মানবিক মিলনমেলায় কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আবেগ ও প্রত্যাশা।

নিহত আনাসের মা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আপনি (তারেক রহমান) আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে আমাদের শহীদ সন্তানদের হত্যার বিচার করবেন, এটাই আমাদের বিশ্বাস। অন্তর্বর্তী সরকার যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল, তা এখনও পূর্ণ হয়নি। আজও আমার ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি। আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
শহীদ জাহিদের মা ফাতেমাতুর জোহরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার জিসানকে যদি না পাই, এই দুনিয়াতে আমার আর কেউ নেই। আমার বড় ছেলে আমাকে আদর করে আম্মু, মা বলে ডাকতো।
আজ ১৭ মাস হয়ে গেছে, কেউ আর আমাকে সেই নামে ডাকে না। আমার বড় ছেলে মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে বলেছিল, জিসান চলে গেলেও আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না। কিন্তু আজ সে-ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
আমি কী নিয়ে বাঁচবো? তিনি আরও যোগ করেন, এই কঠিন সময়ে বিএনপির পরিবার যদি আমার পাশে না দাঁড়াতো, তাহলে সম্ভব হতো না আমার সন্তানের চিকিৎসা করা। অনেকেই পাশে দাঁড়ায়নি, কিন্তু বিএনপি আমাদের পাশে ছিল।
আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমাদের সন্তানদের হত্যার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই করা হবে।
সভায় উপস্থিত অন্যান্য পরিবারের সদস্যরাও আবেগপ্রবণ হয়ে একে একে তাদের গল্প শেয়ার করেন। কেউ কেউ মৃত সন্তানের স্কুলের ব্যর্থতার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ আবার আহত সন্তানদের দীর্ঘ চিকিৎসা ও আর্থিক অসুবিধার কথা তুলে ধরে।

তাদের প্রত্যেকের মুখেই মিলিত ছিল শুধু দুঃখ নয়, ন্যায়বিচারের আকুতি, আর সেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রত্যাশা যা তাদের প্রিয়জনদের হারানোর পর থেকেও পূরণ হয়নি।
তারেক রহমানও শুনলেন গভীর মনোযোগের সঙ্গে। স্বজনহারাদের চোখে চোখ রাখলেন, কণ্ঠে কণ্ঠ মেলালেন। তিনি তাদের আশ্বস্ত করলেন যে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের দাবি বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন।
সভার এক পর্যায়ে তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, রাজনীতির স্বার্থ নয়, মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার।
এই মতবিনিময় সভা কেবল রাজনৈতিক আয়োজন নয়; এটি একটি মানবিক মিলনমেলা যেখানে শহীদদের পরিবার, আহতরা এবং দলীয় নেতৃত্ব একত্রিত হয়ে অনুভব করলেন দুঃখ-সন্তাপের ভারসাম্য। অনুষ্ঠানটি ‘মায়ের ডাক’ ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।
দুই সংগঠনের সহযোগিতা ও আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের কষ্ট, আশা ও প্রত্যাশা প্রকাশ করতে সক্ষম হন।
সভায় স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে যে, শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, পরিবারের পাশে থাকা, শোনার সংস্কৃতি এবং মানবিক সমবেদনা তাদের জন্য এক বিশাল সহায়ক শক্তি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মুখে বারবার প্রতিফলিত হলো, ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও, তাদের আশা এখনও অম্লান।
তারা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতের সরকার, বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে, তাদের প্রিয়জনদের হত্যার বিচার হবে।
শেষে শহীদ জাহিদের মা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাই। তার পরিবার ও তার মায়ের জন্য দোয়া করি। ইনশাআল্লাহ তিনি আমাদের পাশে থাকবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে।
রোববারের এই মতবিনিময় সভা প্রমাণ করল, রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কণ্ঠও এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে, যেখানে কেবল রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের দাবি নয়, মানবিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তাও সমানভাবে গুরুত্ব পায়।


















