মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের কাজ কেবল অর্থনীতি বা বিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক আচরণ-সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, আমরা যে মৎস্যসম্পদ নিয়ে কাজ করি, তা আমাদের সামগ্রিক জীবনবোধের অংশ। বিষয়টিকে শুধু অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পূর্ণতা আসবে না।
ঢাকায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-এ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের গবেষণা প্রস্তাবনা পর্যালোচনা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন (২০২৫–২৬)’ শীর্ষক ইনসেপশন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, হালদা নদী সাধারণ মানুষের সম্পদ। তাই গবেষণার উপস্থাপনা ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন এমন ভাষায় হওয়া উচিত, যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে। প্রেজেন্টেশন ও শিরোনাম ইংরেজিতে হতে পারে, তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন অবশ্যই বাংলায় প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সামাজিক-অর্থনৈতিক গবেষণায় নারীদের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, হালদা নদীপাড়ের বাস্তবতা বোঝার জন্য সেখানকার নারীদের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সামাজিক-অর্থনৈতিক গবেষণা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। গবেষণা পদ্ধতিতেই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
হালদা নদীর বর্তমান ঝুঁকি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, মানুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডই নদীর জন্য প্রধান হুমকি। ‘এনথ্রোপোজেনিক’ শব্দ ব্যবহার করে বিষয়টিকে আড়াল না করে একে মানুষের ভুল ও ক্ষতিকর কাজ হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ভুজপুর রাবার ড্যাম ক্ষতিকর হলে তা অপসারণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। গবেষণা চলমান থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলেও মত দেন তিনি।
নদীতীরবর্তী তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিন ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কিছুটা সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা যায়।
স্লুইস গেট ব্যবস্থাপনা ও আগ্রাসী প্রজাতি ‘সাকার ফিস’ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই ফিস লুটেরা শ্রেণির মতো। এ মাছের মতো জাতীয় সংসদেও লুটেরা যেন প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ভালো মানুষ নির্বাচিত করতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্য থাকতে হবে। শুরুতেই সময় বৃদ্ধি নির্ধারণ না করে বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় তা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি ২০২৬ সালের শেষ বা ২০২৭ সালের শুরুতে একটি মধ্যমেয়াদি কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তাব দেন, যাতে প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা যায়।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় হালদা নদী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্রের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. ইমাম উদ্দীন কবীর। সম্মানিত অতিথি ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ।
স্বাগত বক্তব্য দেন চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. আমিরুল ইসলাম। টেকনিক্যাল সেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিএফআরআই-এর সিনিয়র স্পেশালিস্ট ড. মো. খলিলুর রহমান। এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোশরেফা আলী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সামসিল আরেফিন এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস কে ইশতিয়াক আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য রাখেন।


















