ব্যবসা মন্দা, আয় সংকোচন ও রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি
- আপডেট সময় : ১২:৩০:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় হচ্ছে না। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি ছুঁয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এনবিআরের তথ্য–উপাত্ত বলছে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা
দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগের গতি কম, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্লথগতি, সব মিলিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা বিরাজ করছে। সরকারও কৃচ্ছ্রসাধনের নীতিতে চলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। বাস্তবে আদায় হয়েছে লক্ষ্যের তুলনায় ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা কম। রাজস্ব আয়ের তিনটি প্রধান খাত—আয়কর, আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সবখানেই উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে আয়কর খাতে।
প্রথম ছয় মাসে আয়কর খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। তবে আদায় হয়েছে মাত্র ৬১ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তি ও করপোরেট উভয় পর্যায়েই আয় সংকুচিত হওয়ায় আয়কর আদায়ে এই বড় ধস নেমেছে। ব্যবসার টার্নওভার কমে যাওয়ায় অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করের প্রবাহও স্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
আমদানি পর্যায়েও সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আলোচ্য সময়ে আমদানি শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৫২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। শিল্প ও সরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগ স্থবির থাকায় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যার ফলে সরকার প্রত্যাশিত শুল্ক আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ভ্যাট খাতেও ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় ভোগব্যয় হ্রাস পেয়েছে, যা ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি অস্বাভাবিক নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন না বাড়লে রাজস্বও বাড়বে না। তাঁদের মতে, সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষার মনোভাব নিয়েছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসতে পারে এবং রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ব্যবসার টার্নওভার বাড়লেই কেবল রাজস্ব আদায় বাড়বে। আয় না বাড়লে কর আসবে কীভাবে—এটাই বাস্তবতা। তিনি মনে করেন, নতুন রাজনৈতিক সরকার করনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর বিনিয়োগ নির্ভর করবে।
অন্যদিকে আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, নতুন সরকার এলেও স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তাঁর ভাষায়, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পুরনো খাতের ওপর কর বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় টেকসই সমাধান নয়।
অর্থনীতির এই চাপের আরেকটি বড় কারণ মূল্যস্ফীতি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৮.২৯ শতাংশ। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে মানুষের ভোগক্ষমতা আরও সংকুচিত হচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ধরে রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতিও এখনো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও কমেছে। সাময়িক হিসাবে ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এটি বড়জোর ৪.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতায় রাজস্ব আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত চাপ দিলে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে, এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের। সূত্র কালের কণ্ঠ


















