নিবন্ধন ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের নীরবতায় ক্ষোভ, প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেবে আমজনগণপার্টি
- আপডেট সময় : ০৭:২৭:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ৭১ বার পড়া হয়েছে
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আমজনগণ পার্টি র আহ্বায়ক ড. রফিকুল আশীন নিবন্ধন ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের নীরবতায় ক্ষোভ, প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেবে আমজনগণপার্টি
আমিনুল হক ভূইয়া
নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘসূত্রতা ও নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি। দলটির দাবি, সব শর্ত পূরণ ও গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও চূড়ান্ত নিবন্ধন সনদ না দিয়ে কমিশন কার্যত তাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত করে তুলেছে।
শনিবার বিকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্ত হয়ে, আমজনগণ পার্টির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আমীন অভিযোগ করেন, নিবন্ধনের চূড়ান্ত সনদ চেয়ে গত ২৭ নভেম্বর, ১৮ ও ২৪ ডিসেম্বর তিন দফায় নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনকে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এতে স্পষ্ট, কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে নির্বাচন কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. রফিকুল আমীন বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই নির্বাচন কমিশন হয়তো আমাদের দুর্বল ভাবছে। কিন্তু এভাবে ন্যায়সঙ্গত দাবি উপেক্ষা করা হলে আমরা আইনি প্রতিকারের পথ বেছে নিতে বাধ্য হব। ড. আমীন জানান, বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টির সারাদেশে বর্তমানে ১২৭টি সক্রিয় কার্যালয় রয়েছে। প্রায় ২৫ হাজার তালিকাভুক্ত সদস্য নিয়ে দলটি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে ৫১ হাজার পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণসহ আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে কোনো নতুন দলের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বলে দাবি করেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর। অথচ চূড়ান্ত নিবন্ধন সনদ না পাওয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে আমজনগণ পার্টি। দলটির দাবি, নির্বাচন কমিশনের অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

ড. রফিকুল আমীন বলেন, আমরা নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিশ্বাস করি। কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে আমাদের চূড়ান্ত নিবন্ধন সনদ দিতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য সময় দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম সমাজের দর্পণ। অন্যায় ও বৈষম্যের শিকার মানুষের শেষ আশ্রয় আপনারাই। রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আমরা আপনাদের সামনে এসেছি।
নিজের রাজনৈতিক যাত্রার পটভূমি তুলে ধরে ড. রফিকুল আমীন বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা মামলায় তাকে ১২ বছরের বেশি সময় কারাবরণ করতে হয়েছে। কারাগারে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তিনি এবং তার সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সময়েই প্রতিহিংসাহীন ও বিকল্প রাজনৈতিক ধারার চিন্তা থেকে একটি নতুন দল গঠনের পরিকল্পনা করেন তিনি।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তৃত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। নিজস্ব প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে গত ২২ জুন নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে দলটি। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা-২০০৮ অনুসারে ১টি কেন্দ্রীয়, ২৩টি জেলা এবং ১০৩টি উপজেলা/থানায় কার্যালয় ও কমিটি গঠনসহ সব শর্ত পূরণ করে আবেদন জমা দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত করে সব তথ্য সঠিক পান বলে জানান রফিকুল আমীন।
এই প্রক্রিয়া শেষে গত ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টিসহ তিনটি নতুন রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। তবে ১৮ নভেম্বর দুইটি দলকে চূড়ান্ত নিবন্ধন দেওয়া হলেও আমজনগণ পার্টির বিষয়ে আপত্তি এসেছে জানিয়ে শুনানির কথা বলা হয়, যার তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। দলটির অভিযোগ, অভিযোগগুলো কী-তা আজও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। বরং বেনামি ও পরিকল্পিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুনঃতদন্ত করা হয়েছে।

এমনকি ৯ অক্টোবর সারাদেশে পুনরায় তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে অফিস ভবনের মালিকের এনআইডি, জমির দলিলসহ অপ্রাসঙ্গিক তথ্য চেয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হয়। রফিকুল আমীন আরও অভিযোগ করেন, ১ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে দলের কার্যালয়, কমিটি ও সদস্যদের তথ্য যাচাই করানো হয়েছে, যা নজিরবিহীন। পুনঃতদন্তেও সবকিছু সঠিক পাওয়ার পরও কমিশন সিদ্ধান্ত না জানানোয় প্রশ্ন উঠেছে তাদের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা নিয়ে। ড. রফিকুল আমীন বলেন, যে নির্বাচন কমিশন নিজ কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না, বারবার সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে, তারা কীভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অবিলম্বে চূড়ান্ত নিবন্ধন সনদ না দিলে আমরা আইনি ও সাংবিধানিক সব পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হব।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। শোনা যায়, কমিশনের সামনে কেউ অনশনে বসলে কিংবা নানা চাপ সৃষ্টি করলে দল নিবন্ধন দেওয়া হয়, এমনকি সাংগঠনিক অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও। অথচ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সব শর্ত পূরণ করা একটি নতুন রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কমিশন যদি চাপের মুখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তারা কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে পালন করবে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
সব বিষয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর আবার অসন্তোষ প্রকাশ, এরপর গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত এসবই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন। আরও উদ্বেগজনক হলো, দুই দফায় নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পরও সেই প্রতিবেদন আমলে না নেওয়া। এতে কমিশনের ভেতরেই আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে নির্বাচন কমিশন নিজ সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারে না এবং নিজের কর্মকর্তাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে ব্যর্থ হয়, তাদের পক্ষে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন কতটা সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়।



















