জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের ঘোষণা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার চাই
- আপডেট সময় : ০৬:২৬:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১১ বার পড়া হয়েছে
আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আবেগে আপ্লুত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০০৭ সোলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ১৮ মাস কারাবাসের ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন তারেক রহমান। সেখানে ১৭ বছর নির্বাসিত থাকার পর বৃহস্পতিবার তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ব্যক্তিগত ফেরা নয়, বরং দেশের রাজনীতিতে নতুন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করেন তিনি। একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেওয়ার সেই দৃশ্য উপস্থিত নেতা–কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকী মুহূর্ত দেশ ও জনগণের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
এক অভিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় পর দেশের মাটিতে পা রেখে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আবেগ, প্রতীকী বার্তা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমান ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সংলগ্ন এলাকায় তিনি খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করেন এবং একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেন। এই দৃশ্য উপস্থিত নেতা–কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশের প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার প্রতীকী প্রকাশ। বিমানবন্দরে তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন পরিবারের সদস্যরা। নাতনী জাইমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে দেখা যায় তাঁকে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাল-সবুজে সাজানো বাসে করে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের গণসংবর্ধনা অভিমুখে রওনা হন।

তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বিমানবন্দর থেকে সরাসরি গুলশানের বাসভবনে যান। পরে তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সেখান থেকে গুলশানের বাসভবনে ফেরেন। সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা ও পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকা পরিণত হয় লাল-সবুজের উৎসবভূমিতে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল, স্লোগান ও ব্যানারে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
গণসংবর্ধনাকে ঘিরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত পুরো রুটে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় বহুস্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয়। রাস্তার দুই পাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সারিবদ্ধ উপস্থিতি দিনটির গুরুত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বেলা ৩টা ৫০ মিনিটে তারেক রহমান মঞ্চে ওঠেন। সাত মিনিট পর বক্তব্য শুরু করে প্রথমেই উচ্চারণ করেন, “প্রিয় বাংলাদেশ।” মুহূর্তেই করতালি ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। পাশে ছিলেন দলের শীর্ষ নেতারা। বক্তব্যে তারেক রহমান স্মরণ করেন বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭১ ও ২০২৪। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যেমন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তেমনি ২০২৪ সালে সর্বস্তরের মানুষ এক হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের মানুষ আজ কথা বলার অধিকার ও গণতন্ত্রের অধিকার ফিরে পেতে চায়।
নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরে তিনি বলেন, পাহাড় ও সমতলের মানুষ, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান, সবাইকে নিয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চান, যেখানে নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ফিরতে পারবে। তাঁর এই বক্তব্য বারবার সমাবেশে প্রতিধ্বনিত হয়। সম্প্রতি শহীদ হওয়া জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদির কথা উল্লেখ করে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ওসমান হাদি এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৭১ ও ২০২৪-এর শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তরুণ প্রজন্মের ওপর আস্থা রেখে তারেক রহমান বলেন, আগামীর বাংলাদেশ গড়বে তরুণরাই। গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে পরপর তিনবার উচ্চারণ করেন, আমরা দেশের শান্তি চাই। মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম নয়, আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান।” তাঁর ভাষায়, দেশ গড়ার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, তবে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত সহযোগিতা, যা ছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতি এক কূটনৈতিক আহ্বান। গণসংবর্ধনার পাশাপাশি এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনেও দেখা যায় বিপুল জনসমাগম।
বিএনপি সমর্থক ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে জড়ো হন। অনেকের ভাষায়, এই পরিবেশ ঈদের উৎসবের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একজন নেতার দেশে ফেরা নয়; এটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রত্যাশায় মানুষের আশা, স্বপ্ন ও রাজনৈতিক প্রত্যয়ের প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।




















