চিংড়ি শিল্পে নারী শ্রমিক বৈষম্যের শিকার, সমস্যা সমাধানের তাগিদ ডেপুটি স্পিকারের
- আপডেট সময় : ০৯:৫৮:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ৮১৭ বার পড়া হয়েছে
চিংড়ি শিল্পে নারী শ্রমিকদের অবস্থান ঃ বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ
চিংড়ি শিল্পে নারী শ্রমিক বৈষম্যের শিকার, সমস্যা সমাধানের তাগিদ ডেপুটি স্পিকারের
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নোনা জলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় কাজ করে চলেছেন উপকূলের সাদা সোনা তথা চিংড়ি শিল্পে যুক্ত নারী শ্রমিকেরা। দিনভর অমানুষিক শ্রম দিয়েও পুরুষের সমান মজুরী প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। তাদের নিরাপদ টয়লেটের অভাব। নোনা জলে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই মরণব্যাধি জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঘটনা ঘটছে! আক্রান্ত অনেকে আবার অল্প বয়সে জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে। সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে লালিত স্বপ্নে পাখা পুড়ে গিয়েছে বিষাক্ত কঠির ব্যধির সংক্রমণে।

শনিবার সাতক্ষীরায় চিংড়ি শিল্পে নারী শ্রমিকদের অবস্থান, বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে ধরা গলায় কথাগুলো অনর্গল বলে যান নারী শ্রমিকেরা। দৈদ্যুতিক মাইকের ভল্যুম তখন কেঁপে কেঁপে ওঠছিল। হল ভর্তি মানুষ শুনছিল সেই নারী শ্রমিকের দুঃখগাঁথা জীবনের কঠিন গল্প। যাদের শ্রমে চিংড়ি চালান বিদেশের পথে জাহাজে ওঠে আর ফিরে আসে ডলার হয়ে, সেই চিংড়ি শিল্পের শ্রমিকের কান্না কেউ শোনেনা।
চিংড়ি শ্রমিক যমুনা, রেখা রানী ও শেফালী বিবি প্রমুখ কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে চিংড়ি শিল্পে নিয়োজিত নারী সমাজের দুঃখগাঁথা। তারা তাদের কাজের ন্যায্য মজুরীর নিশ্চয়তা চান। কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ চান।
কেন এমন হয়? কিসের অভাব। সেই প্রশ্নের সঠিক কোন উত্তর না মিললেও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. শামসুল হক টুকু, এমপি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, চিংড়ি শিল্পের নারী শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সরকার মালিক ও শ্রমিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেছেন, মালিক যদি শ্রমিকদের স্বার্থ না দেখে, তাহলে তো শ্রমিকেরাও মালিকদের স্বার্থ দেখবে না।

মূল প্রবন্ধে উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল, জানালেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চিংড়ি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের মধ্যে চিংড়ির অবদান প্রায় ৮৬ শতাংশ। চলতি সময়ে ১ দশমিক ৪০ লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে এবং বছরে চিংড়ি আহরণ প্রায় ৫ হাজার টন।
মি. মোহন তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, চিংড়ি খামারে কর্মরত শ্রমিকের ৮০ শতাংশ নারী। তারা নৈমিত্তিক শ্রমের পদ্ধতিতে কাজ করে। নারী শ্রমিকেরা চরম বৈষম্যের শিকার। খামারগুলোতে নারী ও পুরুষ শ্রমিক সমাজ কাজ করলেও একজন পুরুষ শ্রমিক পায় ৩৫০ টাকা এবং নারী শ্রমিক পান ১৮০-২০০ টাকা।
শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবে ‘চিংড়ি শিল্পের নারী শ্রমিকদের অবস্থান ঃ বাস্তবতা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ‘লিডার্স’। তাতে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
আলোচনায় অংশ নেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার এমপি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য বেগম শামসুন নাহার এমপি।
সংলাপে ডেপুটি স্পিকার বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম চিংড়ি খাত নানাভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে এই খাতে জড়িত নারী শ্রমিকরা নানাভাবে নিপড়ীনের শিকার হচ্ছেন। জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পিছিয়ে থাকা এ সকল নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর প্রতি বিদ্যমান সকল বৈষম্য নিরসনে কাজ করতে হবে।

উপমন্ত্রী হাবিবুর নাহার বলেন, নানা ষড়যন্ত্রের মুখে দেশের চিংড়ি খাত। এর মধ্যে অন্যতম শ্রমিক সংকট, বিশেষ করে নারী শ্রমিক। মজুরি কম ও পুরুষের চেয়ে বেশি সময় কাজ করার কারণে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে এই খাতের নারী শ্রমিক। চলমান সংকট দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধানের মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের সকল অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।
সংসদ সদস্য শামসুন্নাহার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নারী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০০৬ সালে শ্রমিকদের মজুরি ছিল এক হাজার ৬০০ টাকা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো গঠনের মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি করেন। চিংড়ি শিল্পের নারী শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আহ্বান জানান তিনি।
মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের নারী চিংড়ি শ্রমিকদের সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে আয়োজিত সংলাপ থেকে দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশে বলা হয়, পুুরুষ শ্রমিকের ন্যায় নারী চিংড়ি শ্রমিকদের সমমজুরী প্রদান করতে হবে। চিংড়ি খামারে স্বাস্থ্যকর ও কাজের উপযুক্ত শালীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। টয়লেটের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। খামারে বিশ্রাম নেওয়া মত ছায়াযুক্ত স্থান ও খাবার পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। বজ্রপাতের সময় তাৎক্ষণিক আশ্রয়ের জন্য সেডের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দূর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।
ওয়াটারকিপার্স-বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল, শেরে বাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প কর্মকর্তা হালিমা বেগম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র যুগ্ম সম্পাদক আমিনুর রসুল বাবুল, একাত্তর টিভি’র সহযোগী প্রধান বার্তা সম্পাদক পলাশ আহসান, স্ক্যান সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মুকুল, অক্সফ্যাম প্রতিনিধি শাহাজাদী বেগম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।




















