Joshimath Sinking: জমির ফাটল থেকে ওঠে আসছে জল, হাজারো মানুষ গৃহহীন যোশীমঠ ঘিরে শঙ্কা!
- আপডেট সময় : ০৮:৫১:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৩ ৩৩৩ বার পড়া হয়েছে
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা উড়িয়ে চলেছে উন্নয়ন
সন্তোষ সেন, কলকাতা
যোশীমঠকে অত্যন্ত বিপ্পজনক, বিপ্পজনক অবাপাতত বিপন্মুক্ত এই তিনটি জোনে বিভক্ত করে বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গেল। পুরো শহরটিকেই বসবাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাহলে এটাই কি পুরো উত্তরাখণ্ড ও অন্যান্য পাহাড়ি শহরগুলোর ভবিষ্যত, আমরাও নিরাপদ তো?
প্রথমেই দেখা যাক, কীভাবে এই শহরটি গড়ে উঠেছিল। কোন এক সময়ে প্রবল ভূমিকম্পের ফলে পাহাড় থেকে মাটির যে ধস নেমে আসে, জমাট না বাঁধা সেই ঝুরো মাটির ভগ্নাবশেষের ওপর সমুদ্রতল থেকে ৬১৫০ ফুট উপরে উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় গড়ে তোলা হয় যোশীমঠ শহরটিকে।
জোশীমঠে ভয়াবহ ফাটল : ছবি সংগ্রহ
ফলতঃ প্রকৃতির নিয়ম মেনেই শহরের নিচে এখনো রয়ে গেছে প্রচুর পরিমাণে আলগা বালি, পাথর, দুর্বল শিলা এবং মোরেন’ র (হিমবাহ গলে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে) স্তূপ। আর এই কারণেই ভূমিকম্পন প্রবন এই অঞ্চলে ভারী নির্মাণকাজ কোনভাবেই বিজ্ঞাসম্মত নয়। কিন্তু জনবসতি গড়ে ওঠা এবং দেবভুমির তিনটি স্থান বদ্রীনাথ, হেমকুন্ড সাহিব এবং শঙ্করাচার্য মন্দির অঞ্চলে ধার্মিক ও পর্যটকদের নানান সুখ সুবিধে দেওয়া ও আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য প্রকৃতির নিয়মকে তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিতভাবে বড় মাপের পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজে হাত দেওয়া হয়।
সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় শহরের জল নির্গমনের ব্যবস্থাতেও গলদ থেকে গেছে এবং এর সাথে তাল মিলিয়ে পর্যটন শিল্পের রমরমাও বাড়তে থাকে।অন্যদিকে যোশীমঠের এই বিপর্যয়ের জন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকেই দায়ী করছেন স্থানীয় মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে টানেল তৈরির জন্য পাহাড় ফাটাতে বিস্ফোরণ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই বিস্ফোরণে বারবার কেঁপে উঠত গোটা শহর। গত ডিসেম্বর থেকেই যোশীমঠে একাধিক বাড়িতে ফাটল ধরতে শুরু করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগে একাধিক বার এই নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানোর পরেও কোনও লাভ হয়নি।

স্বভাবতই বিপর্যয়ের দায়ি হয়ে কাঠগড়ায় উঠে এসেছে উত্তরাখণ্ডের যত্রতত্র ভুইঁফোড়ের মতো গজিয়ে ওঠা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আর অবাধে বনভূমি ধ্বংস। সাথে যুক্ত হয়েছে পাহাড় ও গাছপালা কেটে বড় বড় রাস্তা তৈরি, যত্রতত্র হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বাড়ি তৈরী, অলকানন্দার দুপারে নুড়ি পাথর ও মাটি তুলে নেওয়া, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে নদীর পাড় বরাবর রাস্তা নির্মাণ, ইত্যাদি। মাটি পাথর বালির বদলে পুরো শহরটাকে কংক্রিটের জঙ্গলে ঢেকে দেওয়ার ফলে পাহাড় থেকে আসা জল বা বৃষ্টির জল মাটির ভিতর প্রবেশ করতে না পারায় তা ভূভাগের উপরিস্তরে বা মাটির নিচে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এই অপরিকল্পিত, অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও নগরায়নের রথ নৈসর্গিক হিমালয় ধ্বংসের পক্ষে যথেষ্ট। এইসব মহাযজ্ঞ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ও ভারসাম্যের বিপরীতে কাজ করছে, ফলে এইসব পরিবর্তনগুলোকে প্রত্যাবর্তনীয় চক্রের মধ্যে নিয়ে গিয়ে আগের অবস্থায় কোনভাবেই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই হিমালয়ের বিপর্যয়ের সাথে সাথে জীববৈচিত্র্য সহ প্রকৃতির ভারসাম্য সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস হওয়ার দিকে নিশ্চিত পায়ে এগিয়ে চলেছে।

কোন্ ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা শুনুন আবহাওয়া বিজ্ঞানী সুজীব কর মহাশয়ের মুখ থেকে। যোশীমঠের বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে দূরদর্শনের এক চ্যানেলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করলেন স্পষ্টভাবে —”২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে গ্ল্যাসিয়ার বার্স্ট করার সময়ই বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানান যে, গ্ল্যাসিয়ারগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গলে যাচ্ছে, হিমালয়ের শিলাস্তর ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে এবং এর ফলে শিলাস্তরের মধ্যে অদ্ভুত একটা টান তৈরি হয়, যার হাত ধরে এর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হচ্ছে। আর যোশীমঠের নিচের দিকে কর্ণপ্রয়াগের শিলা তৈরি বেলে পাথর দিয়ে, যার ধারণক্ষমতা এমনিতেই কম।
বর্তমানে যোশীমঠ অঞ্চলে মাটির তলা দিয়ে প্রচুর পরিমাণে জল প্রবাহিত হচ্ছে, নীচের দিকে মাটি সরে যাচ্ছে। ফলে উপরতলাকার মাটিও হুড়মুড় করে ধসে পড়বে এবং যোশীমঠ সহ পঞ্চপ্রয়াগের সব জনপদ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নিয়ে মাটির তলায় তলিয়ে যাবে। তিনি আরো জানান –”বয়সে নবীন ও ভঙ্গুর-প্রবন হিমালয় এখনো গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার। মানুষের অদূরদর্শিতার কারণে অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ঠেলায় হিমালয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নষ্ট হওয়ার পথে। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে তাকে রিকভার বা মেরামত করার চেষ্টা করলেও আমরা এর সাথে নিজেদের পরিবর্তিত করতে পারছি না।

বিজ্ঞানী সুজীব করের সুরে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই প্রকৃতির ছন্দকে বজায় রাখতে আমরা নিজেদের কাজের ধারায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে তো পারছিই না, বরং কতিপয় মানুষের লোভ লালসা ও আরো আরো মুনাফার অন্ধগতির কবলে পড়ে প্রকৃতির নিষ্পেষণ ও লুণ্ঠন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যার ফলে শুধু উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলই নয়, এর সাথে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরপ্রদেশের উত্তরভাগ সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বড় অংশ এবং সিকিম, দার্জিলিংয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সভ্যতার (!) সব চিহ্নকে সাথে নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে বসে যাবে অতল গহ্বরে।
হিমালয়ের বরফের চাদর সম্পূর্ণ গলে গিয়ে বঙ্গোপসাগর ও আরবসাগরের জলস্তর বাড়িয়ে দেবে কয়েক ফুট। আর এর ফলে সুন্দরবনসহ দুই ২৪ পরগনা, কলকাতা মেদনীপুর ও হাওড়ার এক বিশাল অংশ সম্পূর্ণরূপে জলমগ্ন হবে। ঘরবাড়ি, জমিজমা হারিয়ে বানভাসি বা বাস্তুচ্যুত হবেন কয়েক লক্ষ মানুষ। সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানের ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।
সন্তোষ সেন, শিক্ষাবিদ



















