জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীর হাত ধরে সবুজের হাসি, বনায়নের অভিনব উদ্যোগ ভারতে
- আপডেট সময় : ০৮:১৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ৪৪৯ বার পড়া হয়েছে
‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তৃণমূলের জনগোষ্ঠী একছাতার তলায় শামিল। পতিত জমিতে বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষও উপকৃত হচ্ছে। হাতেনাতে তা দেখিয়ে দিচ্ছে ভারতে’
বিশাল এলাকাজুড়ে পতিত জমি। চারিদিকে ফসলের চিহ্নমাত্র নেই। একদিন এই জমি যেখানে ছিলো রুক্ষ মাটি, আজ সেখানে সবুজের হাসি। নারীর হাত ধরে সবুজ এখানে মাথা তুলে দাড়াচ্ছে।
নজির গড়া এই কর্মকান্ড মানুষকে উৎসাহ যোগাচ্ছে। এমন প্রকল্পে আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষদের তথা প্রভাব ফেলছে অন্যদেশেও।
এমন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে। এখানের ‘ফার্মার্স ফর ফরেস্টস’ নামের সংগঠন পতিত জমিকে জঙ্গলে পরিণত করার কার্যকরে হাত লাগিয়েছেন। আর এই কাজ
করছেন নারীরা। যারা স্থানীয় গাছের চারা লাগাচ্ছেন। এটা শুধু কোনো পুনর্বনায়ন প্রকল্প নয়। তারা এমন জায়গায় চারা লাগাচ্ছেন, যা অনুর্বর এবং পতিত জমি।
‘ফার্মার্স ফর ফরেস্টস’ সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আরতী ধরের মতে জঙ্গলের কথা ভাবলে সেটিকে শুধু কার্বন সংরক্ষণের পাওয়ারহাউস হিসেবে ভাবলে চলবে না। জঙ্গল গোটা
ইকোসিস্টেমের জন্য অসংখ্য সুবিধা এনে দেয়। কার্বন বিচ্ছিন্ন করা থেকে শুরু করে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার চাঙ্গা করে তোলা।
মাটি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্যের জন্য অনুকূল পরিবেশও দেয়। এসব ইকোলজিক্যাল প্রণালি যে পরিষেবা দেয়, আমাদের বাজার এখনো তার আর্থিক মূল্য স্থির করেনি। ইকোসিস্টেম পরিষেবার জন্য মাসুল বাজারের এই ব্যর্থতা সংশোধন করার চেষ্টা করছে।
উদ্যোগ
‘ফার্মার্স ফর ফরেস্টস’ সংগঠন গণেশ ধাভালের মতো ক্ষুদ্র চাষিদের সহায়তা নিচ্ছে। তিনি ২০২০ সালে তার দুই একর অব্যবহৃত জমি সংগঠনকে ইজারা দেন। সেখানে প্রায় ৮,০০০ চারাগাছ লাগানো হয়েছে। ধীরে ধীরে কার্বন ধারণকারী বড় এক জঙ্গল গজিয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জমির মালিক হিসেবে ধাভালে পাঁচ বছর ধরে প্রতি তিন মাস অন্তর ‘ফার্মার্স ফর ফরেস্টস’ সংগঠনের কাছ থেকে প্রায় ১০০ ইউরো করে হাতে পাবেন। জঙ্গলে গাছপালা বড় হয়ে যে ইকোসিস্টেম পরিষেবা দেবে, সেই বাবদ এই অর্থ দেওয়া হবে।
২৩ বছর বয়সী গণেশ ধাভালের ছোটখাটো গ্যারেজের ব্যবসা রয়েছে। তাদের বেশ কিছু কৃষিজমি রয়েছে। শুধু চাষবানের ওপরে ভরসা করে তার ছয় সদস্যের পরিবারের অন্নসংস্থান করা কঠিন
জানালেন ধাভালে। ফলে তাকে উপার্জনের দ্বিতীয় পথ খুঁজতে হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক মানুষ চাষবাস ছেড়ে দিয়েছে। তারা শিল্পখাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। কেউ কেউ নিজের ব্যবসা শুরু করেছে। কারণ, চাষের কাজ আর আগের মতো নেই। সে কারণে আমি টু-হুইলারের
ওয়ার্কশপ চালু করেছি। চাষিরা এখন দৈনিক উপার্জনের পথ খুঁজছে। গত কয়েক বছর ধরে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। তা চলতে থাকলে এলাকায় চাষের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে।

পরিবেশ সংরক্ষণের মাসুল
দুটি লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে ‘ফার্মার্স ফর ফরেস্টস’ সংগঠন পেমেন্ট ফর ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস, সংক্ষেপে পিইএস পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেছে। বর্তমান জঙ্গল সংরক্ষণ ও পতিত
জমিতে নতুন জঙ্গল গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। জিপিএস ট্যাগ ও স্যাটেলাইট ইমেজ কাজে লাগিয়ে সংগঠনের টিম প্রত্যেকটি চারাগাছের অবস্থার ওপর নজর রাখে। এই প্রকল্পের
মাধ্যমে নারী, চাষি ও শ্রমিকদেরও সহায়তা করা হয়। রামদাস শিণ্ডে নামের এক জমির মালিকের সাড়ে তিন একর জমিতে কাজ করছেন। শিণ্ডে বর্তমানে এক পেট্রোল পাম্পে কিছু সময়ের জন্য কাজ করেন। পিইএস প্রকল্প থেকে অর্থ পেতে শুরু করলে তিনি আবার চাষের কাজে ফিরে
যাবার আশা করছেন। তিনি এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হলে তার দেখাদেখি আরও চাষি সেই পথ বেছে নেবেন বলে তার বিশ্বাস।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ
রামদাস শিণ্ডে ও গণেশ ধাভালের আশা, তাদের এই বিনিয়োগের ফলে আগামী প্রজন্মের লাভ হবে। গণেশ ধাভালে বলেন, ফার্মার্স ফর ফরেস্টস উদ্যোগে গাছ লাগালেও জমির ওপর তাদেরই পুরো অধিকার রয়েছে। এই সংগঠনের সঙ্গে পাঁচ বছরের ইজারা চুক্তি সত্ত্বেও জমিতে যে ফলন
হবে, তারাই তা বিক্রি করতে পারবেন। আগামী বছরগুলোতে গাছের ফল ও কাঠের মালিক আমরাই থাকব।
পাঁচ বছর পর প্রকল্প শেষ হলেও ‘ফার্মার্স ফর ফরেস্টস’ সংগঠন অদূর ভবিষ্যতে আরও দাতাদের আকর্ষণ করতে চাইছে। সেটা ঘটলে গোটা অঞ্চলজুড়ে বনায়ন প্রক্রিয়া অগ্রসর হবে। তখন স্থানীয় চাষিরা জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা অনেকটাই সামলে নিতে পারবেন। সূত্র : ডয়চে ভেলে























