ঢাকা ০৫:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর মুসলিমদের মধ্যে ‘মোহাম্মদ’ নামের জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পের বিদ্রূপ বাংলাদেশের কক্সবাজারে রিসোর্টে বিধ্বংসী আগুনে ১০ জনের মৃত্যু, রয়েছে একই পরিবারের ৬জন ব্রহ্মপুত্রে ধরা পড়ল ৯০ কেজির বিশাল বাগাড়, বিক্রি হলো ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষায় উদ্যোগ, খননের মাটি যাবে বৈধ ইটভাটায় কক্সবাজারে মেরিনড্রাইভের এক রিসোর্টে বিধ্বংসী  আগুন, এখন পর্যন্ত ৭ নিহত শ্রীমন্ত নদীর তীরে মানবতার বাতিঘর (১) ষষ্ঠীপূজায় ২৪ হাজার মণ্ডপে দুর্গোৎসবের সূচনা, সম্প্রীতি-সহাবস্থানে মুখর বাংলাদেশ ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে মূল্যস্ফীতির চাপ ও দারিদ্র্য কমার আশা: বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ ডেঙ্গুর মৌসুমে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, এক দিনে আরও ১০ মৃত্যু

শ্রীমন্ত নদীর তীরে মানবতার বাতিঘর (১)

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০১:১৪:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩৫ বার পড়া হয়েছে

শ্রীমন্ত নদীর তীরে মানবতার বাতিঘর

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শ্রীমন্ত নদীর শান্ত জলরাশি, দুই তীরের সবুজ প্রকৃতি আর গ্রামবাংলার চিরচেনা স্নিগ্ধতার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক জনপদ। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে শ্রীমন্ত নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর দরবার শরিফ। এটি শুধু একটি সমাধি কিংবা ধর্মীয় উপাসনাকেন্দ্র নয়, অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা, প্রার্থনা ও মানবিকতার এক মিলনস্থল। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এখানে ছুটে আসেন মনের টানে। কেউ প্রার্থনা করেন, কেউ মানত পূরণে শিরনি দিতে আসেন, আবার কেউ নিছকই খুঁজে ফেরেন মনের প্রশান্তি।

শ্রীমন্ত নদীর তীরে সবুজে ঘেরা বিশাল এই দরবার প্রাঙ্গণকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতির নিস্তব্ধতার সঙ্গে মানুষের বিশ্বাসের যেন এক নিবিড় সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। নদীর জোয়ার-ভাটার মতোই এখানে প্রতিদিন মানুষের আসা-যাওয়া। কেউ আসেন দূর-দূরান্ত থেকে, কেউ আবার আশপাশের গ্রাম থেকে। সবার উদ্দেশ্য এক নয়, কিন্তু প্রত্যেকের হৃদয়ে রয়েছে নিজস্ব বিশ্বাস, প্রত্যাশা ও প্রার্থনা।

শুক্রবার দরবার শরিফ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে শফিক ভাই ও আমি  শিরনি বা তবারক খাচ্ছিলাম। এমন সময় একটি ব্যাগে চাল ও গুড় নিয়ে দ্রুতপায়ে সেখানে প্রবেশ করলেন এক নারী। তাঁর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। সিঁথিতে গাঢ় সিঁদুরের রেখা। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, আমি আজই শিরনি দিতে চাই। এখনই দিয়ে দিন।

শান্ত গলায় জানতে চাইলাম, মা-জননী, আপনি কোথা থেকে এসেছেন?

জানালেন  তাঁর নাম পুতুল রাণী। বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা এলাকায়। তাঁর চোখের জল, ব্যাকুলতা আর শিরনি দেওয়ার আকুলতা যেন এই দরবারের প্রতি মানুষের গভীর আবেগেরই একটি প্রতিচ্ছবি। তাঁর মতো অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন এখানে আসেন। তাঁদের কারও মনে সন্তানের জন্য প্রার্থনা, কারও জীবনের সংকট থেকে মুক্তির প্রত্যাশা, আবার কারও উদ্দেশ্য প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা। নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতি অনুসারে তাঁরা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন, ক্ষমা চান এবং ফিরে যান একধরনের মানসিক প্রশান্তি নিয়ে।

শ্রীমন্ত নদীর তীরে মানবতার বাতিঘর

ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে

শুক্রবার ভোর থেকেই দরবারের বিশাল প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায়। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ ও প্রবীণ সব বয়সের মানুষ আসেন এখানে। শ্রীমন্ত নদীর তীরে দরবার কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেছে দীর্ঘ শানবাঁধানো ঘাট। নদীর শান্ত জলে অনেকে গোসল করেন। কেউ মানত অনুযায়ী সন্তানের প্রথম চুল কামানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন, কেউ মনের আশা পূরণ কিংবা সন্তান কামনায় নদীতে স্নান করেন। নারীদের জন্য রয়েছে পৃথক ইবাদতখানা, যেখানে তাঁরা নামাজ আদায় ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন।

এই দরবারের বিশেষত্ব হলো, এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রাধান্য পেয়েছে ইবাদত, প্রার্থনা ও আত্মিক প্রশান্তির পরিবেশ। প্রচলিত অর্থে ঝাড়ফুঁক, পানিপড়া কিংবা তাবিজের ব্যবসার পরিবর্তে এখানে মানুষকে ইবাদত ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণের পরিবেশে দেখা যায়। দরবারের এই আবহ আগত মানুষের মনে স্বস্তি ও প্রশান্তি এনে দেয় বলে তাঁদের অনেকের বিশ্বাস।

এখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে না। মুসলমানের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও আসেন। প্রত্যেকে নিজের বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতি অনুসারে প্রার্থনা করেন। তাঁদের এই উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আশা-আকাঙ্ক্ষা কিংবা প্রিয়জনের জন্য মঙ্গল কামনার অনুভূতির কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয় নেই। মানুষের বিপদে আশ্রয় খোঁজা, ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং শান্তির প্রত্যাশা সর্বজনীন।

শ্রীমন্ত নদীর বুক চিরে চলাচলকারী কোনো কোনো নৌযান দরবারের কাছাকাছি এসে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। আবার কোনো নৌযান গতি কমিয়ে দরবার অতিক্রম করে পরে স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করে। স্থানীয়দের কাছে এটি হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রচলিত রীতি। নদীর বুকে ভেসে চলা নৌযানের এই দৃশ্য দরবারকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরে।

মহিলা ইবাদাত ঘর

বিনামূল্যে শিরনি

দরবার শরিফের অন্যতম আকর্ষণ শিরনি বিতরণের রীতি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগত মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে শিরনি বা তবারক বিতরণ করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ এখানে বসে শিরনি গ্রহণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে আপ্যায়ন, উদারতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ।

কেউ একা আসেন, কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ আসেন দল বেঁধে। তাঁদের জন্য শিরনি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অতিথিপরায়ণতার যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা দরবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তোলে। এখানে আগত অনেকের কাছে শিরনি শুধু খাবার নয়, এটি তাঁদের বিশ্বাস, স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত একটি অনুষঙ্গ।

হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণে তাঁর উদারতা, সরল জীবনযাপন এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা উঠে আসে। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত দরবারকে ঘিরে আজও যে বিনামূল্যে শিরনি বিতরণের রেওয়াজ চালু রয়েছে, তা সেই মানবিক ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

দরবারের আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন পণ্যের দোকান। এসব দোকানকে ঘিরেও প্রচলিত আছে এক ব্যতিক্রমী রেওয়াজ। স্থানীয়ভাবে শোনা যায়, হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.) জীবিত থাকাকালে তাঁর দোকানে আসা ক্রেতাদের প্রয়োজনমতো পণ্য নিয়ে মূল্য রেখে যাওয়ার সুযোগ দিতেন। তিনি নাকি ক্রেতাদের বলতেন, তোমার যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু নিয়ে টাকা রেখে যাও।

এই স্মৃতিচারণের তাৎপর্য শুধু কেনাবেচার পদ্ধতিতে নয়, বরং মানুষের প্রতি আস্থা রাখার মানসিকতায়। একজন ক্রেতার সততা ও বিবেকের ওপর নির্ভর করে পণ্য নেওয়া এবং মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার ধারণার মধ্যে বিশ্বাস ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের একটি দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই কাহিনি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। দোকান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ক্রেতার নিজের হাতে নির্ধারিত বাক্সে টাকা রেখে যাওয়ার যে রেওয়াজের কথা শোনা যায়, সেটিও সেই আস্থা ও সততার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.) নিয়মিত পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। ধর্মীয় সাধনার পাশাপাশি শ্রমনির্ভর জীবনযাপনের এই বর্ণনা তাঁকে মানুষের কাছে আরও আপন করে তুলেছে। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা দরবারে তাই শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে।

যে দোকানে কোন লোক নেই, আছে বিশ্বাস

যেভাবে পৌঁছেছিলাম মির্জাগঞ্জের দরবারে

সময়টা সম্ভবত ২০২০ সাল। ঢাকার সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) বাগানে সতীর্থ শফিকুল ইসলামের মুখে প্রথম শুনেছিলাম হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর দরবার শরিফের কথা। এর আগেও ঢাকার বিভিন্ন সড়কের মোড়ে গোলাকার লাল দানবাক্স দেখেছি। সেসব বাক্সে লেখা থাকত মির্জাগঞ্জ ইয়ারউদ্দিন খলিফার দরবারের জন্য দান।

শফিক ভাইয়ের কাছে দরবারের কথা শুনে সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হলো। সেই যাত্রায় সঙ্গী হলেন আবু আলী ও তোফাজ্জল হোসেন। আমরা চারজন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লঞ্চে উঠে বসলাম। পরিকল্পনা অনুযায় ভোরে পটুয়াখালী পৌঁছে সেখান থেকে রিকশায় পায়রা নদীর খেয়াঘাটে যাওয়া। নদী পার হয়ে ফের রিকশায় পৌঁছানো যাবে দরবার শরিফে। পুরো পথের পরিকল্পনা আগেই সাজিয়ে নিয়েছিলেন শফিক ভাই।

বিশাল লঞ্চ বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর বুক বেয়ে মেঘনার বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে এগিয়ে চলেছে। গভীর রাত। চারদিকে প্রায় নিস্তব্ধতা। অধিকাংশ যাত্রী ঘুমে আচ্ছন্ন। মাঝে কানে ভেসে আসে বায়ুত্যাগের শব্দ। কিন্তু আমার চোখে ঘুম আসে না। কখনো চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করি, আবার নদীপথের অন্ধকারে অন্য কোনো লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লাগার আশঙ্কায় চমকে জেগে উঠি। নদীপথের দীর্ঘ যাত্রায় এমন উৎকণ্ঠা থাকলেও লঞ্চের দক্ষ চালক ও কর্মীদের ওপর ভরসা রেখেই এগিয়ে চলি আমরা।

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় নদীবিধৌত পটুয়াখালীর গ্রামীণ জনপদ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সূর্যের নরম আলোয় লঞ্চটি পটুয়াখালী টার্মিনালে এসে ভিড়ল। ঘুমজড়ানো চোখে নারী-পুরুষ দ্রুত নেমে যাচ্ছেন। শফিক ভাইকে অনুসরণ করে আমরাও টার্মিনালে পা রাখলাম। এরপর দুটি রিকশায় আমাদের গন্তব্য পায়রা নদীর খেয়াঘাট।

সকালের আলো ফোটার আগেই পটুয়াখালী শহরের কর্মব্যস্ততা আমাদের নজর কাড়ল। পরিচ্ছন্ন সড়ক, মানুষের চলাচল আর নতুন দিনের প্রস্তুতি, সব মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের এই জেলা শহরটি আমাদের ভালো লাগল। নদী পার হয়ে আবার রিকশায় চড়ে এগিয়ে চললাম মির্জাগঞ্জ দরবারের  উদ্দেশে।

পরিকল্পনা ছিল, বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার লঞ্চে রওনা দিয়ে শুক্রবার সকালে পৌঁছানো, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া, গোসল সেরে জুমার নামাজ আদায় করা, দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলে এলাকায়ে ঘুরে বেড়ানো। সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করেই আমাদের চারজনের মির্জাগঞ্জ সফর।

দরবারে পৌঁছে চারপাশের পরিবেশ, নদীর ঘাট, সবুজ প্রাঙ্গণ এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমাদের মুগ্ধ করল। এখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের এক স্বাভাবিক পরিবেশ রয়েছে। কেউ শিরনি বিতরণ করছেন, কেউ আগতদের পথ দেখাচ্ছেন, কেউ আবার নিরিবিলি বসে প্রার্থনা করছেন। কোথাও যেন তাড়াহুড়োর চেয়ে বিশ্বাস ও আবেগের উপস্থিতিই বেশি অনুভূত হয়।

হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত

নদীর তীরে মানবতার বাতিঘর

একটি ধর্মীয় স্থানের পরিচয় শুধু তার স্থাপনা, আচার-অনুষ্ঠান কিংবা দর্শনার্থীর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের জীবনে সেই স্থানের প্রভাব, মানুষের প্রতি তার আচরণ এবং সেখানে লালিত মূল্যবোধও গুরুত্বপূর্ণ। হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর দরবার শরিফকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা, বিনামূল্যে শিরনি বিতরণের রীতি এবং স্থানীয়ভাবে প্রচলিত সততা ও আস্থার কাহিনিগুলো সেই বৃহত্তর পরিচয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

শ্রীমন্ত নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নদীর স্রোত দেখতে দেখতে মনে হয়, সময় বদলায়, মানুষের জীবন বদলায়, বদলে যায় সমাজের নানা রীতিও। কিন্তু মানুষের মনে শান্তির আকাঙ্ক্ষা, বিপদে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা এবং অন্য মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার প্রত্যাশা কখনো হারিয়ে যায় না। এই দরবারে আসা মানুষের চোখের জল, তাঁদের প্রার্থনা, শিরনি দেওয়ার আকুলতা কিংবা নদীর ঘাটে নীরবে বসে থাকার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে সেই চিরন্তন অনুভূতিই প্রকাশ পায়।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে শ্রীমন্ত নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই দরবার তাই অনেকের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় গন্তব্য নয়, এটি স্মৃতি, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত এক বিশেষ স্থান। নদী যেমন আপন গতিতে বয়ে চলে, তেমনি মানুষের হৃদয়ে প্রবাহিত বিশ্বাসও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে।

সন্ধ্যা নামলে নদীর বুকে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। কিন্তু দরবারকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসের আলো নিভে যায় না। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন, প্রার্থনা করেন, শিরনি বিতরণ করেন এবং মনের প্রশান্তি নিয়ে ফিরে যান নিজ নিজ গন্তব্যে। শ্রীমন্ত নদীর তীরে এই বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মানবিকতার সম্মিলিত উপস্থিতিই যেন হযরত ইয়ারউদ্দিন খলিফা (রহ.)-এর দরবারকে মানুষের কাছে এক ‘মানবতার বাতিঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :