ঢাকা ০১:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ, এমপি গাজী নজরুল ৪ দিনের রিমান্ডে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ৮১তম জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু হাসপাতালে ১,৫৯৩ চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বাড়াতে বি-টু-বি টাস্কফোর্স গঠনের তাগিদ মুষলধারে বৃষ্টিতে তলিয়ে সড়ক অলি গলি, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ চরমে ভয়াবহ বিস্ফোরণে মানুষ উধাও ইসরায়েলকে ৬০ হাজার ভারী বোমা দিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় গ্রিডে নতুন ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট যুক্ত গ্যাস শিল্পাঞ্চলে স্বস্তি

মুষলধারে বৃষ্টিতে তলিয়ে সড়ক অলি গলি, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ চরমে

আমিনুল হক ভূইয়া
  • আপডেট সময় : ০১:৩৮:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে

মুষলধারে বৃষ্টিতে তলিয়ে সড়ক অলি গলি, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ চরমে

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নগরবাসীর প্রশ্ন বৃষ্টি হলেই কেন ঢাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়? বছর বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ, ড্রেনেজ উন্নয়ন জলাবদ্ধতা নিরসনের নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও কেন সামান্য কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বড় একটি অংশ পানির নিচে চলে যায়?

 এক দিনের ব্যবধানে যেন বদলে গেল রাজধানীর আবহাওয়া। গত শনিবারও  ছিল প্রচণ্ড গরম, দেশের ১২ জেলায় বয়ে গেছে তাপপ্রবাহ। আর আজ রোববার সকালেই সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ভিজেছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। মাত্র ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। সামান্য বৃষ্টিতেই তীব্র জলাবদ্ধতার পেছনে ঢাকার দুর্বল ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি, পাশাপাশি আবর্জনায় শহরের অধিকাংশ ড্রেন ভরাট থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। অন্যদিকে, একসময়কার প্রাকৃতিক জলাধার ও খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথও সংকুচিত হয়েছে। এর সঙ্গে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও অতিরিক্ত কংক্রিটের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে মাটির স্বাভাবিক পানি শোষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং অল্প বৃষ্টিতেই নগরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকা পানিতে ডুবে যাচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ডে মাত্র ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রয়েছে। তাও আবার ৯ ঘণ্টায়। তাও আবার নিষ্কারের অভাবে তলিয়ে গেলো মেগাসিটির অলি-গলিসহ শহরের অধিকাংশ রাস্তা। বেলা সাড়ে ১০টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুলের পাশের প্রধান সড়কটি ছিলো জলমগ্ন। বহু যানবাহন আটকা ঠায় দাড়িয়ে ছিলো। বহু যানবাহন অকেজো হয়ে জলাবদ্ধতায় আটকে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি করে। রাজারবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, সিদ্ধেশ্বরী, মগবাজার, রমনা, বেইলীরোড, শান্তিনগর, নয়াপল্টন, কাকরাইল, পকিরাপুল, মতিঝিল, সেগুনবাগিচা, সচিবালয়ের সামনের রাস্তা, পুরাতন-নতুন ঢাকা সবখানেই পানিতে সয়লাব। কোথাও কোথাও উন্নয়ন কাজ চলার কারণে যে প্রতিবন্ধকতার সৃস্টি হয়েছে, বৃষ্টিতে তা আরও প্রকট আকার ধারণ করে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠায় বৃষ্টিপাত বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, পূর্বাভাসে কিছু এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ বলা হয়েছিল। বাস্তবে অনেক এলাকায় তা বেড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে সাগরে ইতোমধ্যে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ভারতের ওডিশা বা অন্ধ্র প্রদেশ উপকূল এলাকায় গভীর নিম্নচাপ, এমনকি ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে।

নগরবাসীর প্রশ্ন বৃষ্টি হলেই কেন ঢাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়? বছরের পর বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও কেন সামান্য কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বড় একটি অংশ পানির নিচে চলে যায়? নগরবাসীর অভিযোগ, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন আর নতুন কোনো সমস্যা নয়,  বরং এটি নগরজীবনের স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকার আসে, সরকার যায়, মেয়র ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও পরিবর্তিত হন, কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা কাটে না। প্রতিবছর বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই সেই উন্নয়নের বাস্তব চিত্র প্রকাশ পায় সড়কে জমে থাকা পানিতে।

রাজধানীর অনেক এলাকায় খাল ও জলাধার দখল, ড্রেনের অপর্যাপ্ততা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণসামগ্রী ও ময়লা-আবর্জনায় নালা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ বলে নগর পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত না হয়ে সড়কেই আটকে থাকে। বিশেষ করে বাড্ডা থেকে কুড়িল পর্যন্ত মেট্রো ট্রেনের কাজ চলছে। এখানে যেসব গর্ত বা ড্রেনের মতো করা হয়েছে, তা বৃষ্টির পালিয়ে ভরে গিয়ে যানবাহন চলাছল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অসহনীয় যানজট। কর্মস্থলগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ পথচারীদের পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে। বহু অফিসগামী মানুষ সকালে ঘর ছেড়ে দুপুরে অফিস পৌছাতে পেরেছেন।

মুষলধারে বৃষ্টিতে তলিয়ে সড়ক অলি গলি, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ চরমে

রোববার সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন সড়কের চিত্র ছিল প্রায় একই। ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে যায়। কোথাও যানবাহন ধীরগতিতে চলেছে, আবার কোথাও পানি পার হতে গিয়ে বিকল হয়েছে গাড়ি। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা মিশে সড়কের পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। আবহাওয়া অধিদপ্তর  জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জে ৮২ মিলিমিটার। তবে দেশের সব এলাকায় একই মাত্রায় বৃষ্টি হয়নি।

বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকেন। কোথাও কোমরসমান পানি না হলেও হাঁটু বা গোড়ালি পর্যন্ত পানি পেরিয়ে চলতে হয়েছে পথচারীদের। অনেক শিক্ষার্থীকে জুতা হাতে নিয়ে পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। গণপরিবহনের সংকটের পাশাপাশি রিকশা ও অটোরিকশার ভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে নগরবাসীকে।

মালিবাগের বাসিন্দা জাব্বার আকন যাবেন কর্মস্থল মতিঝিলে। প্রায় একঘন্টারও বেশি সময মালিবাগ মোড়ে অপেক্ষার পর কোন যানবাহন না পেয়ে অবশেষে পায়ে হেটে অফিসের পথে রওনা দেন। খিলগাওয়ের গৃহবধূ মালেদা বেগম সন্তানকে স্কুলে নিয়ে রিকশাভাড়া ব্যয় করে ৩০-৪০ টাকা। এদিন  তাকে ব্যয় করে হয়েছে ৫০ টাকা। অফিস-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে। যা তাদের বাজেটে ছিলো না।  বৃষ্টির সঙ্গে যানজট যুক্ত হওয়ায় দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। যে পথ স্বাভাবিক সময়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে অতিক্রম করা সম্ভব, জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে সেটি পার হতে লেগেছে এক ঘণ্টারও বেশি। এতে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে না পারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হতে বিলম্ব, রোগী পরিবহনে সমস্যা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন সব মিলিয়ে বৃষ্টির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে।

মগবাজারের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের অভিযোগ,  বৃষ্টির পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে জমে থাকা ময়লা ও আবর্জনার দুর্গন্ধে পরিবেশ আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘসময় পানিতে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কষ্টকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ কিংবা বৃষ্টির সময় পাম্প বসিয়ে পানি সরানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পুরো নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা, দখলমুক্ত করা, বিদ্যমান ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের সমন্বয় জরুরি।

কারণ জলাবদ্ধতা এখন কেবল বর্ষাকালের সাময়িক দুর্ভোগ নয়, এটি ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। প্রচণ্ড গরমে যেমন নগরবাসীকে ভুগতে হয়, তেমনি কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই শুরু হয় আরেক দফা দুর্ভোগ। প্রতিবছর বড় বাজেট, নতুন প্রকল্প ও নানা প্রতিশ্রুতির পরও যদি কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানীর প্রধান সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই সমস্যা কি শুধু বৃষ্টিতে, নাকি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতায়?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :