প্রজনন মৌসুম মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
- আপডেট সময় : ০৭:৩৩:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৪৩ বার পড়া হয়েছে
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় বুধবার (৭ অক্টোবর) দিনগত রাত ১২টা থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বরিশালের মেঘনা তীরবর্তী হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলাকে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
তবে এ দুই উপজেলায় অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবল নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেও বরিশাল বিভাগে এ অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হওয়ায় অভিযানের বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে আগের প্রায় চার ভাগের এক ভাগে।
এর ওপর বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। ফলে সীমিত বাজেট ও জনবল নিয়ে দীর্ঘ ২২ দিন নদীতে অভিযান পরিচালনা করা মৎস্য বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের অর্থ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার রাজস্ব খাতের বরাদ্দ দিয়েই মা ইলিশ রক্ষার অভিযান চালাতে হবে। আগে প্রতিটি উপজেলায় অভিযানের জন্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ পাওয়া গেলেও এবার পাওয়া যাবে মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ টাকা।
এই অর্থে নৌযানের জ্বালানি, অভিযান পরিচালনা ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো কঠিন। ফলে অভিযানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, শুধু প্রশাসনিক অভিযান কিংবা সভা-সেমিনারের মাধ্যমে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। নদীতে জেলেদের নামা ঠেকাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও নদীতীরবর্তী ব্যবসায়ীদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

হিজলা উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ফারুক খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ক্ষমতাসীনদের সহযোগিতা ছাড়া ইলিশ রক্ষা কঠিন। রাজনৈতিকভাবে সমর্থন না থাকলে নদীতে ইলিশ ধরার প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা এবার জেলেদের নদীতে না নামানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাব হোসেন খোকন দপ্তরী সংবাদমাধ্যমকে জানান, তারা ওরাকুল মাছঘাটে জেলেদের নিয়ে সভা করেছেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে না যাওয়ার বিষয়ে জেলেদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক দিপেন জমাদ্দার জানান, মা ইলিশ রক্ষায় উপজেলা টাস্কফোর্সের সভা হয়েছে। সেখানে নৌ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজিব আহসানসহ সংশ্লিষ্টদের ইলিশ সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মা ইলিশ রক্ষায় তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে বলেও জানান তিনি।
মেহেন্দীগঞ্জে দায়িত্ব পালনকারী মুলাদী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, একই সঙ্গে দুই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা কঠিন। এর মধ্যে কোনো প্রকল্প না থাকায় বরাদ্দের সংকট রয়েছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
এবারের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, গত জুনে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওই প্রকল্পের অর্থ থেকেই অভিযানের বড় একটি অংশের ব্যয় নির্বাহ করা হতো।
এখন রাজস্ব খাতের বরাদ্দ দিয়েই অভিযান পরিচালনা করতে হবে। আগের মতো বাজেট না থাকায় ২২ দিনের অভিযান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। আগের বরাদ্দ অনুযায়ী দুই দিনেই নৌযানের জ্বালানি খরচ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা নদীতে এবার দুটি লঞ্চ রাখা হবে। পাশাপাশি স্পিডবোটও থাকবে। নদীতীরবর্তী ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ জন্য প্রতিটি ঘাট থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পাঁচজন করে জনবল নেয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চিঠি দেয়া হয়েছে।
তবে মা ইলিশ সংরক্ষণের মূল এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নেই। জেলেদের নদীতে নামা ঠেকাতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
অভিযান চলাকালে জেলেদের সহায়তা হিসেবে প্রতিটি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। বরিশাল জেলায় এ কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফের চাল পাচ্ছে ৭৯ হাজার ৮৯০ পরিবার।
বিপরীতে জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৮৪ হাজার ২৯৫ জন। ফলে নিবন্ধিত জেলেদের একটি অংশ এ সহায়তার বাইরে থাকছে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, টাস্কফোর্সের সভার মাধ্যমে নদীতীরবর্তী বাজার ও ঘাটগুলোতে জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে। তবে ইলিশ সংরক্ষণে ব্যবহৃত একটি প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ায় এবার অর্থ সংকট তৈরি হতে পারে। ওই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি উপজেলায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হতো।
এখন রাজস্ব খাত থেকে প্রতিটি উপজেলায় পাওয়া যাবে মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। এর মধ্যে জ্বালানির দামও বেড়েছে। ফলে এই সীমিত অর্থে দীর্ঘ সময় অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, মা ইলিশ রক্ষা শুধু মৎস্য বিভাগের বিষয় নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সারা দেশে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ টন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগ থেকে ৪ লাখ টন ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের বড় অংশই এ বিভাগের নদ-নদী ও উপকূলীয় জলসীমা থেকে আসে। ফলে মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে বরিশালের বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও কমেনি দাম। নগরের অন্যতম বড় ইলিশের মোকাম পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে সরবরাহ বাড়ার বিপরীতে দাম বাড়ার চিত্র দেখা গেছে।
পোর্ট রোডের মৎস্য আড়তদার নাসির উদ্দিন জানান, রোববার (৪ অক্টোবর) হঠাৎ করে প্রতি মণ ইলিশের দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের এলসি সাইজের ইলিশের দাম ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার টাকা কেজি দরে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফল করতে হলে শুধু অভিযান পরিচালনাই যথেষ্ট নয়; পর্যাপ্ত অর্থ, নৌযান, জ্বালানি ও জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। অন্যথায় অর্থ ও জনবল সংকটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ নিষেধাজ্ঞা কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।











