মজুদ পর্যাপ্ত, তবু বাজারে তেলের সংকট মুনাফাখোরদের কারসাজি
- আপডেট সময় : ০৩:০৮:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সামনে এনে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা চলছে। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও একটি অসাধু গোষ্ঠী অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং নতুন করে তেলবাহী জাহাজও আসছে। ফলে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই ডিজেল, যা মূলত কৃষি সেচ ও পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়। বাকি অংশের মধ্যে রয়েছে পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল। দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশই এই জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের শুরুতে দেশে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, এই মজুদের মধ্যে ডিজেলের প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোলের ১৫ দিনের, অকটেনের ২৮ দিনের, জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের এবং ফার্নেস অয়েলের প্রায় ৯৩ দিনের চাহিদা পূরণ করার মতো মজুদ রয়েছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান গত ৩ মার্চ বিপিসি ভবনে সাংবাদিকদের জানান, দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি মাসে বেশ কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছাচ্ছে এবং নতুন করে আমদানির এলসিও খোলা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বন্দরে একটি জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাস চলছে। আজ সোমবার আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন এবং গুজব ছড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন।

সম্প্রতি নাটোরের সিংড়া এলাকায় বাঁশঝাড়ের নিচে প্রায় ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুত রাখার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। পরে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ওই তেল জব্দ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। প্রশাসনের মতে, এই ধরনের মজুতদারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সরকার সতর্কতার অংশ হিসেবে সীমিত আকারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে অনেক মানুষ এই সিদ্ধান্তকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে অতিরিক্ত তেল মজুত করার চেষ্টা করছেন, যা বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।
এদিকে দেশের জ্বালানি উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে স্থানীয় উৎস থেকে। বিশেষ করে পেট্রোলের প্রায় পুরোটা এবং অকটেনের বড় অংশই দেশে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে এই পেট্রোল উৎপাদন করা হয়। অনেক সময় কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত পেট্রোল দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। অন্যদিকে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন। ফলে এই দুই জ্বালানির ক্ষেত্রে দেশ অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক আতঙ্কের কারণে কয়েকদিন ধরে পেট্রোল পাম্পগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বিক্রি হয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে আসবে বলে তারা আশা করছেন।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজব ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


















