পিছিয়ে পড়া নারীদের জীবনে দীপ জ্বালাতে চান ‘আয়েশা’
- আপডেট সময় : ১০:৪৬:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জুন ২০২৩ ৬৭২ বার পড়া হয়েছে
অনিরুদ্ধ
একদিন বা দু’দিন কারো হাতে কিছু তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। বরং কর্মহীন মানুষের হাতকে ‘কর্মীর’ হাতে পরিণত করা উচিত। তাতে পিছিয়ে পড়া মানুষ স্বনির্ভরের পথে হাটবে। এই ভাবনাকে বাস্তবায়নের তাগিদটা তাকে তাড়া করে ফিরতো। কিন্তু তার সংকল্পই তাকে এগিয়ে যেতে শক্তি যোগায়। বাবা-মায়ের আর্শিবাদকে সঙ্গী করে মাত্র কয়েকজন পিছিয়ে পড়া নারীকে প্রশিক্ষণ শুরু মধ্য দিয়ে স্বপ্নে বীজ বোনেন।
এখন আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয় না। সকল বিদ্রুপ সমালোচনা বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে। তিনি এখন উদাহরণ, অনেক মা-বোনের অবলম্বন। কোন ডামাঢোল পেটানো নয়, নীরবে-নিভৃতে কাজ করে চলেছেন তিনি।
একাধারে লেখক, সংবাদকর্মী, সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাসিন্দা। চলনে-বলনে আধুনি রুচিসম্মত। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারেন, যেকোন বাধা ডিঙ্গিয়ে। তার সংকল্পই তাকে শক্তিযোগায়। আইন শাস্ত্রে লেখাপড়া করেছেন। ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আইনী সহায়তা দেবার ইচ্ছে রয়েছে। প্রগতিশীল সমাজ চিন্তক এই নারীর নাম আয়েশা আক্তার। বাংলাদেশ উদ্যোক্তা ফাউণ্ডেশন-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাড়ি কুমিল্লার শহরতলীতে।

এখানে বাটিক, সেলাই, হাতের কাজ ইত্যাদির ওপর বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে পাঁচটি সেলাই মেশিন রয়েছে। আয়েশার কাজ দেখে কয়েকজন মানব দরদী মেশিনগুলো স্বেচ্ছায় তুলে দিয়েছেন তার হাতে। এজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আয়েশা।
কর্মের প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ তা প্রাথমিক আলাপেই বোঝা গিয়েছিল। কুমিল্লায় একটি প্রোগ্রামে তার সহযোগিতা নিয়েছিলাম। তিনি বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক সময়ে এসে আমার জন্য অপেক্ষা ছিলেন। তখন নিজেকে লজ্জিত মনে হয়েছিল। দুঃখিত বলায় একমুখ হাসি ছড়িয়ে বললো, ‘আরে না না, একি বলছেন? তার বিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। তার মধ্যে একটা আলো দেখতে পেয়েছিলাম আমি। কোথায় যেসন তার সঙ্গে প্রচণ্ড একটা মিল খুজে পেলাম।

ধীরে ধীরে আলাপ-আলোচনা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে কুমিল্লায় নজরুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নারী উন্নয়ন, নারীদের বিভিন্ন কাজ নিয়ে আলোচনা। এক পর্যায়ে জানা গেল তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ উদ্যোক্তা ফাউণ্ডেশনের গল্প।
কাজের সময় শহর এবং আশপাশে চলাচল করতে হয়। চলার পথে প্রায়শই পিছিয়ে নারী দুঃখ-কষ্ট তাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিত। অনেকদিন হাতের খাবারও দিয়ে দেবার নজির আছে। তাদের জন্য কিছু করতে হবে। বিছানায় শুয়েও কোন শান্তি পাচ্ছেন না। গভীর রাত পর্যন্ত তাকে ভাবিয়ে নিয়ে যায়। না আর কোন ভাবনা নয়। এসব মানুষদের জন্য ক্ষুদ্র আকারে হলেও একটা কিছু শুরু করতে হবে। এমন দৃঢ় সংকল্পে তার জোয়াল শক্ত হয়। এবার কিছুটা শান্তি পাওয়া পান। মাথার চাপটা ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে।

তিল তিল করে দীর্ঘ দিনের ঘাম ঝরানো যতটুকু সঞ্চয় ছিল, তা দিয়েই সূচনা করলেন। ‘বাংলাদেশ উদ্যোক্তা ফাউণ্ডেশন’-এর ব্যানারে দুঃস্থ নারীদের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন আয়েশা। স্থান বলতে বাড়ির একটি ঘর। সেখানেই শুরু হল প্রশিক্ষণের কাজ। দিনে দিনে সংকল্প পাখনা মেলে। নিজের মনের মধ্যে কেমন যেন একটা শক্তি অনুভব করেন আয়েশা।
কাজের গতির সঙ্গে মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তার এই অনুকরণীয় কাজ দেখতে পেয়ে দু’টি বেসরকারী ব্যাংকের তরফে চারটি সেলাই মেশিন দিয়ে সহায়তার হাত বাড়ান তারা। এবার আয়েশার শক্তি আরও বাড়ে। সাহসের ভিত্তিটা মজবুত মনে হয়। প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারীদের বিনীতভাবে বললেন, সমাজে মাথা উঁচু করে বাচতে হলে কাজের কোন বিকল্প নেই। কাজ শিখে নিজেদের সাবলম্বি হতে হবে। তখন নিজেদের আয়রোজগার দিয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব হবে।

কমান্ডার একটা মেশিন দিয়েছেন। রোটারিয়ান কামরুন্নাহার, বর্তমান সদর আসনের সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহার উদ্দীন বাহার-এর মেয়ে ডা. তাহসিন বাহার সূচনা, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সর্বদাই সহযোগিতা করেন। রয়েছেন আমার কিছু শ্রদ্ধা ভাজন ব্যক্তিত্ব। যারা দেশ বিদেশে থেকেও ঈদের সময় কিছুটা এগিয়ে আসেন। শুভাকাঙ্ক্ষীরা সংগঠন তথা কাজকে ভালো বাসেন।
করোনা নামক অজানা এক ভাইরাস গোটা দুনিয়া গ্রাস করে। এটি মানুষে মানুষে ছড়ায় বলে, লকডাউন, মানুষে মানুষে দুরত্ব এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে পা রাখা বন্ধ করে মানুষ। পৃথিবীতে কালে কালে বহু ভাইরাস এসেছে, কিন্তু করোনা নামক ভাইরাসটি মানুষের মৃত্যুই শুধু নয়, বিশ্বঅর্থনীতিকে নাজুক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবী মানুষ বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দেয়।
এমন দুঃসময়ে ঘরে বসে থাকতে পারেননি আয়েশা। তিনি জানান, অনেকেই লজ্জায় কারো কাছে হাত পাততে পারেননি। এমন অনেকেরে বাড়িতে রাতের আঁধারে খাবার পৌছে দিয়েছেন। অনেককে বলে দিয়েছেন, ফেসবুকের মেসেঞ্জারে নাম ঠিকানা দিয়ে দিতে। তারপর সেই ঠিকানায় রাতের বেলা খাবার পৌছে দিয়ে এসেছেন। অনেকে বলেছেন, স্বজনরা কোন খোজ পর্যন্ত নেন নি, অথচ তুমি-অনেকে আবেগে চোখেন জল ফেলেছেন।

আয়েশা জানালেন, তার সংগঠন প্রধানমন্ত্রী খাদ্য সহায়তা থেকে এক টন করে চাল পান। সেই চাল দুঃস্থ নারীদের মধ্যে বিতরণ করেন। তাছাড়া প্রতি ঈদে উপহার সামগ্রী বিতরণ করে থাকেন। এবারে আসন্ন কোরবানীর ঈদ উপলক্ষ্যেও উপহার সামগ্রী বিতরণ করবেন।
সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের সামলম্বি করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। ভবিষ্যতে নারীদের জন্য বড় আকারে কিছু করার ইচ্ছে রয়েছে। মানব সেবার মধ্য দিয়ে সমাজের মলিনতা দূর হয়। একারণেই তিনি আমাদের সমাদের শুভবোধের সারথী। আয়েশা আক্তার সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জীবনে দীপ জ্বালাতে চান।




















