পিআইবিতে ডিআরইউ সদস্যদের দু’দিনের ডিজিটাল সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ
- আপডেট সময় : ১২:১১:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫ ২০৭ বার পড়া হয়েছে
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে পিআইডির মহাপরিচালক, পরিচালনা বোর্ডের সদস্য, ডিআরইউ’র সাধারণ সম্পাদকসহ পিআইবির কর্মকর্তারা
ফেক চেক থেকে মোবাইল রিপোর্টিং, দক্ষতা বাড়াতে সাংবাদিকদের হাতে নতুন দিগন্ত
আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৩৫ জন সদস্যকে নিয়ে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজন করে দুইদিনের ‘ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা’। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতা এবং গুজব প্রতিরোধে সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা হাতে-কলমে শিখেছেন আধুনিক সাংবাদিকতার কৌশল, মোবাইল সাংবাদিকতা এবং ফেক চেক পদ্ধতি।
২০ ও ২১ অক্টোবর (সোম ও মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেন, গুজব ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কলমই হতে হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এখন সময়ের দাবি।
প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রথম দিন মোবাইল সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন ইউল্যাব ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টির শিক্ষক নাজিয়া আফরিন মনামী। তিনি অংশগ্রহণকারীদের মোবাইল সেটিংস, ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ, ভিডিও ফ্রেমিং এবং মোবাইল ভিডিও ধারণের ব্যবহারিক কৌশল শেখান। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
পরবর্তী সেশনে ব্র্যাকের কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট শাফাত রহমান মোবাইল ভিডিও ধারণ ও এডিটিংয়ের নানা দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। তিনি ল্যান্ডস্কেপ বনাম ভার্টিকাল শট নির্বাচন, ফিল্ড শুটিং, দলভিত্তিক ভিডিও প্রজেক্ট এবং দ্রুত সম্পাদনার কৌশল শেখান। অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, ভিডিও ধারণ ও এডিটিং বিষয়ে আলাদা দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে আরও দক্ষতা অর্জন সম্ভব হবে।

দ্বিতীয় দিনের সবচেয়ে আলোচিত পর্ব ছিল ‘ফেক চেক’ প্রশিক্ষণ। এই সেশন পরিচালনা করেন পিআইবির প্রশিক্ষক জিলহাজ উদ্দিন নিপুন, যিনি দেশে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রশিক্ষণের অন্যতম অভিজ্ঞ মুখ। তিনি তুলে ধরেন, কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিমূলক ছবি, ভিডিও বা তথ্য তৈরি হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের কীভাবে তা যাচাই করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ের একটি উদাহরণ-খাগড়াছড়ির আন্দোলনের সময় নেপালের একটি ছবি বিকৃতভাবে প্রচার করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা অপচেষ্টা করা হয়। পিআইবির ফেক চেক টিমের প্রধান সুমাইয়া আখতার দেখান, কীভাবে ছবির উৎস যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কিছু ভুয়া ছবি বিশ্লেষণ করে অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে দেখান।
চব্বিশের গণ-আন্দোলন তথা গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে এবং বিদেশেও পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়। যা কিনা এখনও থেমে নেই। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ছাড়াও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে গুজব, অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা তথ্য সহযোগে সংবাদ পরিবেশন, কৃত্রিমভাবে তৈরি বিভ্রান্তিমূলক ছবি প্রকাশ ইত্যাদির অব্যবহারের প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে হাত লাগায় পিআইবি।
এরই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের জুলাই আন্দোলন সমাপ্তির পর ‘বাংলা ফেক্ট’ নামে ডিজিটাল ফরমেটে একটি আলাদা বিভাগ চালু করে পিআইবি। এই বিভাগটি ফেক্ট চেক-এর কাজ চলেছে।

মঙ্গলবার সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় পিআইবি’র মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, গুজব ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে কলমের শক্তি ব্যবহার করতে হবে। জুলাই আন্দোলনে ঘটনাপ্রবাহের তুলনায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা ছিল অনেক বড়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাংবাদিকদের উচিত ডিজিটাল সাংবাদিকতায় আরও দক্ষতা অর্জন করা। দু’দিনের প্রশিক্ষণে সাংবাদিকরা ‘ডিজিটাল সাংবাদিকতা’র বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা ভবিষ্যতে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি আরও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিআইবির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ও বিএফইউজে’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন। তিনি বলেন, পিআইবি সাংবাদিকদের মানোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। সাংবাদিকতার পরিধি যত বাড়ছে, পিআইবির প্রশিক্ষণও তত বেশি বিষয়নির্ভর হয়ে উঠছে। সাংবাদিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতেও আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ আয়োজন করবে পিআইবি।
ডিআরইউ’র সাধারণ সম্পাদক মইনুল হাসান সোহেল পিআইবির মহাপরিচালককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিতভাবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। ভবিষ্যতে মোবাইল সেটিংস, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল সাংবাদিকতা ও ফ্যাক্ট চেকিং বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণের আয়োজন প্রত্যাশা করেন এই সাংবাদিক নেতা।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে সাংবাদিকরা জানান, এই কোর্স তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো তথ্যবিকৃতি বা প্রতিকূল পরিস্থিতি আরও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সহায়তা করবে।

পিআইবির চলমান কার্যক্রম কেবল প্রশিক্ষণ নয়, বরং গবেষণা, প্রযুক্তি ব্যবহার, নীতিমালা প্রণয়ন ও সাংবাদিকতা পেশার মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত উদ্যোগ নিচ্ছে পিআইবি। তাদের কাজের পরিধির মধ্যে রয়েছ।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাংবাদিকতা বিষয়ক গবেষণা ও তথ্য প্রকাশ।
সংবাদমাধ্যমের নীতিমালা ও উন্নয়ন বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদান।
অনলাইন সাংবাদিকতা, মোবাইল রিপোর্টিং, ও ডিজিটাল নিউজ প্রোডাকশনে প্রশিক্ষণ আয়োজন।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল আর্কাইভ, মিউজিয়াম ও তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ও ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম পরিচালনা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ওয়ার্কশপ, সেমিনার ও সম্মেলনের আয়োজন।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতা যেমন দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে, তেমনি তথ্য যাচাই ও সত্য অনুসন্ধানও হয়ে উঠছে সাংবাদিকদের বড় চ্যালেঞ্জ। পিআইবির এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে, এমনটাই মত দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।



















