ডা. নাজিয়া বিনতে আলম স্বাভাবিক প্রসবের ‘বাতিঘর’
- আপডেট সময় : ০১:১৫:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জুন ২০২৩ ৫৯৭ বার পড়া হয়েছে
লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলমকে সম্মাননাপত্র তুলে দিচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম : ছবি সংগৃহীত
অনিরুদ্ধ
১৯৭২। বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নজর দেন স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে। জনস্বাস্থ্য সুস্থ থাকলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এই ভাবনা থেকেই চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে সকল মেডিকেল কলেজে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তির ব্যবস্থা নিলেন। বঙ্গবন্ধু চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেন। দেশে চিকিৎসকদের বিশেষায়িত ট্রেনিং ও উচ্চতর শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার দূরদর্শী চিন্তা থেকেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের জুন মাসে College of Physicians and Surgeons (BCPS)-কে আইনগত কাঠামোয় সাংগঠনিক রূপদান করেন।
মিটফোর্ড হাসপাতালকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। ১৯৭২ সালে প্রথম ব্যাচের এমবিবিএস (MBBS) শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। এই হাসপাতাল থেকেই ২০১২ সালে এমবিবিএস পাশ করেন ডা. নাজিয়া বিনতে আলম। তার মানবিক দায়িত্ববোধের অংশিদার চিকিৎসক মা-বাবা।
বিশেষ করে বাবার কাজ ও আদর্শকে অনুসরণ করে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ হন ‘মানবিক চিকিৎসক ডা. নাজিয়া’। তার ভাবনায় ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের বিশেষ করে নারীদর চিকিৎসাসেবায় ব্রত হওয়া।
ডা. নাজিয়া নজর দিলেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায়। তিনি ভাবলেন, আজকের সন্তান সম্ভবা মা যদি স্বাভাবিক ভাবে সন্তান জন্ম দেন, তা হলে একটি পরিবারের বাড়িতি ব্যয় হবে না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এমন নারীও আছেন, যে কিনা অর্থ ব্যয় করে সন্তান জন্ম দেবার মত সাধ্য নেই। এমন সংকট মোচনে দু’বাহু বাড়ালেন ডা. নাজিয়া। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই স্বাভাবিক সন্তান প্রসব (নরমাল ডেলিভারি) নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার হাতে একের পর স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের বিষয়টি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এখনও পর্যন্ত প্রায় হাজার খানেক স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের রেকর্ড গড়েছেন ডা. নাজিয়া।

ডা. নাজিয়া বিনতে আলম একাধারে একজন মানবিক চিকিৎসক, সমাজচিন্তক এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।
উন্নত বিশ্বে বেশিরভাগ প্রসব ঘটে হাসপাতালে, সেখানে উন্নয়নশীল বিশ্বে বেশিরভাগ শিশুর জন্ম বাড়িতে প্রথাগত ধাত্রীদের সহযোগিতায়। তাতে নানা জটিলতা পোহাতে হয়। ডা. নাজিয়া এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে প্রান্তিক নারী সমাজকে লজ্জার চৌকাঠ পেরিয়ে হাসপাতাল মুখো করার প্রয়াসের ধারাবাহিকতায় গত মে মাসে ৪৩টি সাধারণ প্রসব সম্পন্ন হয়েছে ডা. নাজিয়ার তত্ত্বাবধানে। এসব মা ও নবজাতক সন্তান সুস্থ রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ), ইউএনএফপিএ, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশে বিগত ২০ বছরে ৭২ শতাংশ মাতৃমৃত্যু কমেছে। বাড়িতে প্রসব ও বাল্যবিবাহের ঘটনা কমে যাওয়া এবং প্রান্তিক পর্যায়ে প্রসবকালীন সেবা বাড়ার ফলে মাতৃমৃত্যুর হার কমার অভাবনীয় সাফল্য ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে।
ডা. নাজিয়া লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দিয়েই প্রসূতি মায়েদের আন্তরিক সেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে ডাক্তার ও নার্সদের সমন্বয়ে টিম গঠন করেন। প্রসূতি রোগীদের হাসপাতালমুখী করার পাশাপাশি নারী স্বাস্থ্য রক্ষায় জোর কদমে কাজ শুরু করেন। বিশেষ করে স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করানোর টার্গেট নিয়ে এগুতে থাকেন।
দিন দিন বাড়তে থাকে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের (নরমাল ডেলিভারির) সংখ্যা। স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের পর মা ও নবজাতক সন্তানের মিলছে বিনামূল্যে ওষুধ ও উপহার সামগ্রী।
চোখে জল আনা এক মানবিক উদ্যোগ। সমাজের এই ব্যতিক্রম সেবায় নিমগ্ন ডা. নাজিয়া বিনতে আলম আমাদের সমাজের শুভবোধের সারথী। তিনি প্রান্তিক মায়েদের চলার পথ আলোকিত করে চলেছেন। তিনি সাধারণ মানুষগুলোর আস্থার বসতি। সন্তান সম্ভবা মায়েদের কাছে এক বাতিঘর ডা. নাজিয়া।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সবার সহযোগিতায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞ। সবার সহযোগিতা নিয়ে আগামীতে তার কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে এই প্রত্যাশা করেন ডা. নাজিয়া বিনতে আলম।



















