শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন: ১৩ ডিসেম্বর সিদ্ধেশ্বরীতে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা
- আপডেট সময় : ০২:০৯:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনার সঙ্গে। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে নিজ বাসা থেকে আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়ে তিনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। স্বাধীনতার চার দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমির একটি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর মরদেহ।
কারফিউয়ের সেই সকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত ঢাকায় নিজের বাসার ছাদে বসে লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলেন সেলিনা পারভীন। এক হাতে সাত বছর বয়সি ছেলে সুমনের মাথায় তেল দিচ্ছিলেন, অন্য হাতে ছিল কলম। যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও লেখাই ছিল তার প্রতিবাদ ও সাহসের ভাষা। এমন সময় একটি মাইক্রোবাস ও একটি লরি এসে থামে বাসার সামনে। মুখ ঢাকা কয়েকজন ব্যক্তি গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তার নাম জানতে চাইলে কোনো দ্বিধা না করেই তিনি নিজের পরিচয় দেন।

অপহরণের সময় ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে সেলিনা পারভীন বলেছিলেন, মামার সঙ্গে খেয়ে নিও সুমন, আমি এখনই ফিরে আসছি। কিন্তু আর ফিরে আসা হয়নি। পরে বন্দিদশায় থাকা দেলোয়ার হোসেন জানান, আটক অবস্থায় তিনি এক নারীর আর্তচিৎকার শুনেছিলেন, যা বেয়নেটের আঘাতে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে উদ্ধার করা তার মরদেহে চোখ ও পেটে বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। সেদিনই আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ নোয়াখালীর কল্যাণনগর গ্রামে জন্ম নেওয়া সেলিনা পারভীনের জন্মনাম ছিল মনোয়ারা বেগম। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে এবং ১৭ বছর বয়সে বিচ্ছেদের পরও রক্ষণশীল সমাজের বাধা ভেঙে তিনি এগিয়ে যান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও জ্ঞানচর্চায় ছিলেন অদম্য। স্কুলশিক্ষক উমা দেবীর অনুপ্রেরণায় বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন তিনি।
১৯৬৬ সালে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় বেগম নূরজাহানের সহকারী হিসেবে সাংবাদিকতায় যাত্রা শুরু হয় তার। পরে ললনা পত্রিকায় প্রতিবেদক, সম্পাদক ও তহবিল সংগ্রাহকের দায়িত্ব পালন করেন। পূর্বদেশ, আজাদ, সংবাদ, ডেইলি পাকিস্তান ও ইত্তেফাকে নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে তিনি পরিচিত সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

১৯৬৯ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক শিলালিপি ছিল তার সাহসী অবস্থানের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধপন্থি লেখা প্রকাশের কারণে পত্রিকাটি পাকিস্তানি শাসকদের কালো তালিকাভুক্ত হলেও ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বাসা হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল, আর পত্রিকার আয় ব্যয় হয় যুদ্ধের প্রয়োজনে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সেলিনা পারভীনের জীবন ও আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল অস্ত্রের নয়, সত্য ও কলমের সাহসী লড়াইও ছিল। সেই লড়াইয়ের অগ্রভাগে থাকা এক অবিচল নাম সেলিনা পারভীন।




















