ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়ার সর্ববৃহৎ সরস্বতী পূজা, ‘গ্রিনেসবুকে’ নাম লিখানোর উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ০৮:০৯:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬ ৭০ বার পড়া হয়েছে
একযোগে ৭২টি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হলো এশিয়ার সর্ববৃহৎ সরস্বতী পূজা। এবছর পূজার আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে ‘গ্রিনেসবুকে’ নাম তোলার পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জগন্নাথ হলের প্রার্থনা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে স্বামী বিবেকানন্দ দাঁড়িয়ে। সামনে হল পুকুরের মাঝখানে ২৫ ফুট উচ্চতার সরস্বতী প্রতিমা। প্রতিবছরের মতো এবারও এখানেই স্থাপন করা হয় সবচেয়ে বড় সরস্বতী প্রতিমা। শিল্পীদের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বিদ্যাদেবীর শান্ত, স্নিগ্ধ অবয়ব-হাতে বীণা, পাশে রাজহাঁস, মুখে গভীর মমতা ও জ্ঞানের দীপ্তি। চারুকলার উদ্যোগে জগন্নাথ হল পুকুরে স্থাপন করা ২৫ ফুটের সরস্বতী প্রতিমাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতিমা বলে জানালেন, চারুশিল্পী রুপা ও পারভেজ।
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নানা বয়সের মানুষজন তাড়াপায়ে এসে হাজির হন জগন্নাত হল মাঠে। চারিদিকে পূজা-অর্চনার মহাযজ্ঞ। সরস্বতী পূজা ঘিলে এযেন মানুষের মিলেন মেলা। জগন্নাথ হল মাঠজুড়ে সারি সারি রঙিন মণ্ডপ। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্ত, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের ঢল নামে এখানে।
সরস্বতী পূজা বাঙালির হৃদয়ে এক অপার আবেগের নাম। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে, যখন বসন্তের প্রথম স্পর্শে প্রকৃতি জেগে ওঠে, তখনই আমরা আরাধনা করি বিদ্যা, জ্ঞান, সঙ্গীত ও শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে। এই পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি জ্ঞানের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করার এক পবিত্র প্রতিজ্ঞা।

ছোটবেলা থেকেই সরস্বতী পূজা আমাদের জীবনে এক বিশেষ আলোকবর্তিকা। সকালবেলা স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে, যখন মা সরস্বতীর সামনে দোয়াত-কলম, বই-পুস্তক সাজিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেয়া হয়, তখন মনে হয়, এ যেন জীবনের প্রতিটি পথে আলো ছড়ানোর প্রার্থনা। শিশুর হাতেখড়ির মুহূর্তে বাবা-মায়ের কোলে বসে যখন প্রথম অক্ষর লেখে, তখন সেই আনন্দ-আবেগ অপূর্ব। চোখে জল চলে আসে, এই ছোট্ট হাত দুটি যেন জ্ঞানের সমুদ্র জয় করবে।
বাঙালির কাছে এই পূজা শুধু দেবী আরাধনা নয়, এটি সংস্কৃতির ধারা, শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা, যৌবনের উচ্ছ্বাস। স্কুল-কলেজের মণ্ডপে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিসর্জনের দৃশ্য-সব মিলিয়ে এক অপরূপ আবেগের জোয়ার। এই দিনে আমরা বুঝি, জ্ঞানই সত্যিকারের মুক্তি, জ্ঞানই ঈশ্বরের সবচেয়ে কাছের পথ।
সরস্বতী পূজা আমাদের শেখায়, অন্ধকারকে ভয় পেয়ো না, আলোর পথে এগিয়ে চলো। মা সরস্বতীর আশীর্বাদে আমাদের জীবন যেন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, সৃষ্টিশীলতায় ভরে উঠুক। শুভ সরস্বতী পূজা জয় মা বাগ্দেবী!

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সরস্বতী হলেন ব্রহ্মার সৃষ্টিশক্তি, যিনি বীণায় সুর বাজিয়ে বিশ্বকে জ্ঞানের সুরে বেঁধে দেন। তাঁর শ্বেত বস্ত্র পবিত্রতার প্রতীক, হংস বাহন সত্যের অনুসন্ধানী, পুস্তক জ্ঞানের ভাণ্ডার। পূজার মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে মনে হয়, সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে… বিদ্যাং দেহি নমোস্তুতে এ যেন আত্মার গভীর থেকে উঠে আসা কান্না আর প্রার্থনা মিলেমিশে একাকার। ধর্ম, বয়স ও পেশার ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এখানে এক কাতারে মিলিত হয়। বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এই চিত্রই বাংলাদেশের উৎসব সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
এবারের পূজার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ‘গ্রিনেসবুকে’ নাম লেখানোর উদ্যোগ। প্লাস্টিক ও কৃত্রিম উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার বার্তা দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূজা উপলক্ষে ব্যবহার করা সামগ্রী, আলোকসজ্জা ও ব্যবস্থাপনাতেও পরিবেশবান্ধব চিন্তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আয়োজকদের ভাষায়, বিদ্যার দেবীর আরাধনা মানেই প্রকৃতি ও মানবতার প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা।
বাংলাদেশে প্রতিটি উৎসবই সার্বজনীন। সরস্বতী পূজাও তার ব্যতিক্রম নয়। খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ আর মিলনের মধ্য দিয়ে এই পূজা কেবল ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, বরং মানবিক চেতনা, সম্প্রীতি ও জ্ঞানের প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। জগন্নাথ হল মাঠে অনুষ্ঠিত এশিয়ার সর্ববৃহৎ এই আয়োজন সেই সত্যকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।



















