অনিশ্চয়তায় অমর একুশে বইমেলা, পহেলা ফেব্রুয়ারিতে একদিনের প্রতীকী আয়োজন
- আপডেট সময় : ০৬:৫৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
অমর একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বইমেলা। ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উদ্ভাসিত এই মেলা ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের স্মরণে উৎসর্গীকৃত এবং প্রতিবছর ভাষা মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে আয়োজন করা হয়। এটি কেবল একটি বইমেলা নয়, বরং লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মিলনমেলা, যেখানে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ প্রকাশ ঘটে
ভাষা শহীদদের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি। বাঙালির আত্মপরিচয়, আবেগ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হওয়ার কথা দেশের সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব-অমর একুশে বইমেলা। কিন্তু এবছর সেই চিরচেনা ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ছেদ পড়েছে। ভাষা মাস এলেও অমর একুশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ইতিহাসে বিরল এই বাস্তবতায় পহেলা ফেব্রুয়ারি শুধু একদিনের প্রতীকী বইমেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে ভাষার মাসের আনুষ্ঠানিকতা। বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাবেক সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন বলেন, রমজানে বইমেলায় আমরা অংশ নেব না তা সাফ জানিয়ে দেওয়া হরেয়ছে। তবে ভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ঐতিহ্য রক্ষার ন্যূনতম দায়বদ্ধতা থেকেই ১লা ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একদিনের এই প্রতীকী বইমেলার আয়োজন করবেন তারা।
অমর একুশে বইমেলা সাধারণত ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু হলেও এবছর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে সময়সূচি নিয়ে শুরু হয় টানাপোড়েন। প্রথমে বাংলা একাডেমি গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারিতে বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর দফায় দফায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মেলা আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পড়ে রমজান মাসে। এতেই আপত্তির মুখে পড়ে বাংলা একাডেমি। প্রকাশকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রমজান মাসে বইমেলায় অংশগ্রহণ মানেই নিশ্চিত লোকসান।
আলমগীর শিকদার লোটন বলেন, গত বছর সাত লাখ টাকা খরচ করে ছয় লাখ টাকা বিক্রি করতে পেরেছি। রমজানে মেলা হলে বিক্রি আরও কমবে। বিকালবেলা মেলা, সন্ধ্যায় ইফতার, তারপর তারাবি এই বাস্তবতায় বই কেনার সুযোগই থাকবে না। মেলা কমিটির আহ্বায়ক আবুল বাশার ফিরোজ শেখ ভাষায় রমজান মাসে মানুষের অগ্রাধিকার ভিন্ন থাকে। সেই সময়ে বইমেলা আয়োজন করলে পাঠক উপস্থিতি যেমন কমবে, তেমনি প্রকাশকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই আমরা ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি। একই মত প্রকাশ করেছেন সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গফুর হোসেন। তার ভাষায়, রমজানে বইমেলা মানেই প্রকাশকদের জন্য নিশ্চিত লোকসান। প্রকাশনা শিল্প এখনও করোনা পরবর্তী ধাক্কা সামলাতে পারেনি।
এ অবস্থায় প্রকাশকদের প্রধান দুই সংগঠন ‘বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতর’ সদস্যভুক্ত অধিকাংশ প্রকাশক রমজানে মেলায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেড় শতাধিক প্রকাশকের স্বাক্ষরসংবলিত চিঠি ইতোমধ্যে সংস্কৃতি উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতর একই দাবিতে বাংলা একাডেমিকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রকাশকরা বলছেন, স্টল ভাড়া, নির্মাণ ব্যয়, কর্মচারীর বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একটি ছোট স্টলেও এক লাখ টাকার নিচে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। অথচ রমজানে সেই পরিমাণ বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য স্টল ভাড়া কমানোসহ একাধিক শর্ত দিয়েছে। দাবি না মানলে তারাও মেলায় অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে।
ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে অমর একুশে বইমেলা আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে একটি আবেগের নাম, যা প্রতিবছর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া এই বইমেলা কেবল একবার ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বন্ধ ছিল। নির্বাচনকালীন সময়েও অতীতে নিয়মিতভাবে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। করোনা মহামারির সময় ছাড়া পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরু না হওয়ার নজির নেই। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী এই মাসে অমর একুশে বইমেলা না হওয়া শুধু একটি আয়োজন স্থগিত নয়, এটি বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় এক গভীর শূন্যতার নাম। সেই শূন্যতাই পহেলা ফেব্রুয়ারির একদিনের প্রতীকী বইমেলায় যেন নীরবে উচ্চারণ করছে ভাষা শহীদদের প্রশ্ন ফেব্রুয়ারি কি এবারও ফেব্রুয়ারি থাকতে পারল?



















