মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধমঞ্চে ইরানের দাপট, পাল্টে গেল হিসাব!
- আপডেট সময় : ০২:৪৭:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের শুরুতে সামরিক উদ্যোগের নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হাতেই। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে ততই বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এখন ধীরে ধীরে যুদ্ধের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ইরানের দিকেই সরে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী বলেছেন, যুদ্ধের শেষ আমাদের হাতেই।
তিনি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহার এবং হামলায় হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিন সপ্তাহ আগেও তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কণ্ঠ এতটা আত্মবিশ্বাসী শোনাবে, এমনটা খুব একটা প্রত্যাশিত ছিল না।
সংঘাতের শুরু হয় ইসরাইলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধবিমান দ্রুত দেখিয়ে দেয় যে তারা প্রায় বাধাহীনভাবে ইরানের আকাশে অভিযান চালাতে সক্ষম।
গভীর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। উল্লেখযোগ্য ক্ষতি বলতে তাদের নিজেদের পক্ষের ভুলবশত হামলার ঘটনাই বেশি ছিল।
এর জবাবে ইরান ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যদিও এর বেশিরভাগই ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করে। এসব হামলায় এ পর্যন্ত ইসরাইলে ১২ জন নিহত হয়েছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা তুলনামূলক কম সফল হয়েছে। তবুও ওই দেশগুলো তাদের বাসিন্দা ও অবকাঠামোকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পেরেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে শান্তি, বিলাসিতা ও সমৃদ্ধির নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিদিন নতুন হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবুও অনেকের মনে হচ্ছে, এই যুদ্ধের ট্রিগার কার হাতে থাকবে তার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ কত দিন চলবে তা নিয়ে একাধিক সময়সীমার কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার পরই কেবল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে যা তারা শুরুতে চায়নি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে। তেলের দাম বেড়েছে এবং জ্বালানির মূল্য দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এতে দ্রুত যুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রাম্প দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছেন।
তবে জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ মনে করেন, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখনও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে।
তার মতে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানে এজেন্ডা ঠিক করার ক্ষমতা থাকা। তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র কমে আসছে। তাই তেহরানের সামনে সংঘাত বাড়ানোর পথই খোলা ছিল।
এ কারণেই তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা করেছে এবং পরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যান ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, খারাপ অবস্থান থেকেও ইরান পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে পেরেছে।
তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি বন্ধের কার্যকর জবাব খুঁজছে। আমার মনে হয় এখন যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ইরানিদের হাতেই।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ শত শত তেলবাহী জাহাজকে সুরক্ষা দিতে বিপুল সামরিক সম্পদ প্রয়োজন হবে। তারপরও পুরো নৌপথ নিরাপদ রাখা কঠিন।
ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র, একটি মাইন বা বিস্ফোরকভর্তি ছোট নৌযানও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রণালিটি পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তেহরানকেই নিতে হবে।
এদিকে আঞ্চলিক সংঘাতের ভেতরে আরও ছোট ছোট সংঘর্ষও বাড়ছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইসরাইলকে বিস্মিত করেছে।
এর জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে। এতে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর লেবানন বিশ্লেষক ডেভিড উড বলেন, হিজবুল্লাহর লক্ষ্য একটাই টিকে থাকা। অন্যদিকে ইসরাইল তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চায়।
সূত্র: গার্ডিয়ান



















