ঢাকায় ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপিকার’ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মদিন পালন
- আপডেট সময় : ১০:৫১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩ ৪০৪ বার পড়া হয়েছে
‘শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান উদযাপিত হয় নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। যার উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্ব ভারতীর সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ শৈলজারঞ্জন মজুমদার’
ঢাকায় এক বিশুদ্ধ আয়োজনে উদযাপিত হল রবীন্দ্র সঙ্গীতের স্বরলিপিকার ও কবিগুরুর সহচর জ্ঞানতাপস শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ১২৩তম জন্ম দিন। সঙ্গীতগুরু আচার্য শৈলজারঞ্জন বাবুর জীবনের ধ্যানজ্ঞান ছিল অবিকৃত সুরে ও উচ্চারণে কবিগুরুর গানের প্রচার করা।
অনিরুদ্ধ
আচার্য শৈলজারঞ্জন ছিলেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ। বিজ্ঞানের সঙ্গে যে রবীন্দ্র সংগীত মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে, তার স্বাক্ষর রাখে গেছেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের স্বলিপিকার শৈলজারঞ্জন। তাঁর জীবদ্দশায় দুই শতাধিক রবীন্দ্র সঙ্গীতের স্বরলিপি করেছেন। এই সাধক মানুষটির জন্মদিনে কবিগুরু এক আশীর্বাদ বাণীতে বলেন,
‘জন্মদিন এল তব আজি
ভরি লয়ে সঙ্গীতের সাজি
বিজ্ঞানের রসায়ন রাগরাগিণীর রসায়নে
পূর্ণ হল তোমার জীবনে
কর্মের ধারায় তব
রসের প্রবাহ যেথা মেশে
সেইখানে ভারতীর আশীর্বাদ অমৃত বরষে’

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর বিশাল হল। রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভর্তি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে। আলোচনা এগোয়। মাঝে মাঝে কবিগরুর গান। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন উভয় বাংলার মানুষ। কারো যেন কোন তাড়া নেই। দুই বাংলার বিশিষ্টজনেরা কথা বলছেন এমনটি নয়, তারা যেন রবীন্দ্রনাথ আর শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সঙ্গীতের আলোকিত পথে হাটছেন। শেষ হয়েও হইলা না শেষ, সময়ের সূতোর টানে এমন তৃষ্ণা নিয়েই কথা শেষ করতে হয় আলোচকদের।

সভাপতির বক্তব্য রাখেন কবির বিন আনোয়ার, পাশে আয়োজক এস বি বিপ্লব, বাম দিকে ড. স্বপন কুমার দত্ত ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সাগরিকা জামালী
‘চয়নিকা’ বাংলাদেশের আয়োজনের উদ্যোগ নেন সংগঠক, ‘রবির কিরণে শৈলজারঞ্জন’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের পরিচালক এস বি বিপ্লব।
রবীপ্রেমীর উপস্থিতির মধ্যে দুই বাংলার স্বনামধন্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সঙ্গীত আচার্যের জন্মদিনের মনোমুগ্ধকর আয়োজন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
এদিন প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান, অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা কবির বিন আনোয়ার, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. স্বপন কুমার দত্ত, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী অধ্যাপক হাশেম খান প্রমুখ। এছাড়াও উভয় বাংলার রবীন্দ্র শিল্পী ও গবেষকরা শৈলজালঞ্জন মজুমদারের গান সঙ্গীত নিয়ে স্মৃতি চারণ করেন।

বাংলাদেশের মতো এতোটা যত্ন সহকারে বরীন্দ্র-নজরুল ”র্চ্চার আর কোথাও হয় না বলেও কারো কারো আলোচনায় ওঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব, বিশিষ্ট লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবির বিন আনোয়ার বলেন, শৈলজারঞ্জন মজুমদার যে কেবল বরীন্দ্রনাথের সহচর ছিলেন তাই নয়, তিনি বরীদ্রনাথের প্রচুর গানের স্বরলিপি করেছেন। নির্ভুল ও শুদ্ধসুরে গান গাওয়ার বিষয়ে নিবেদীত ছিলেন বাংলাদেশের কৃতি সন্তান শৈলজারঞ্জন মজুমদার।
বাংলাদেশে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের বহু ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এই প্লাটফর্ম কাজে লাগিয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশ-ভারত মিলে তার জন্ম দিন পালনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিশ্বভারতীর সাবেক উপাচার্য ড. স্বপন কুমার দত্ত।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও শৈলজারঞ্জন মজুমদারের ছাত্রী ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এই মানুষটির কর্ম ছড়িয়ে রয়েছে। এই বাংলার নেত্রকোনার সন্তান শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে নিয়ে ‘রবির কিরণে শৈলজারঞ্জন’ প্রমাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন এস বি বিপ্লব। আগামীতে আরও কাজ করার একবুক আকাঙ্খা লালন করছেন তিনি।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
রবীন্দ্রসংগীতের প্রখ্যাত ওস্তাদ ছিলেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। যিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের দরবারে রবীন্দ্রসংগীতকে জনপ্রিয় করেছেন। শৈলজারঞ্জন মজুমদার ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই বর্তমান বাংলাদেশের মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজ কণ্ঠে ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার ও হূদয় আমার নাচিছে আজিকে’ কবিতা দুটির আবৃত্তি শুনে তার ভক্ত হয়ে যান। এর পর থেকেই রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে চলে আসেন তিনি। তারপর দীর্ঘ পথচলা।

বক্তব্য রাখছেন ড. স্বপন কুমার দত্ত, পাশে ড. আতিউর রহামন
১৯৩২ সালে শৈলজারঞ্জন মজুমদার শান্তিনিকেতনে রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। কবিগুরুর কাছ থেকে রবীন্দ্রসংগীতের দীক্ষা নেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈলজারঞ্জনের সংগীতের প্রতি ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে ১৯৩৯ সালে সংগীত ভাবনার প্রথম প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেন। শৈলজারঞ্জন অগণিত রবীন্দ্র নাটক, নৃত্য নাটক পরিচালনা করেন। তিনি অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীতের সুর তৈরি করেন। শান্তিনিকেতনের বাইরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান উদযাপিত হয় নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্ব ভারতীয় সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ শৈলজারঞ্জন মজুমদার।
অবশেষে কলকাতার সল্টলেকের বাড়িতে ১৯৯২ সালের ২৪ মে প্রয়াত হন তিনি।

প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মরণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোহনগঞ্জের বাহাম এলাকায় প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্বমানের শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিককেন্দ্রটি হয়ে উঠবে দুই বাংলার রবীন্দ্রসংগীতপ্রেমীদের সেতুবন্ধন ও মিলনক্ষেত্র।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে থাকছে তিন তলাবিশিষ্ট একাডেমি ভবন, কনফারেন্স হল, গ্রন্থাগার, জাদুঘর, সবুজ চত্বর ও পুকুর। আরো থাকছে একাডেমি প্রাঙ্গণে আধুনিক সুবিধাসংবলিত মেলা প্রাঙ্গণ।




















