ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ভোলা–৩ আসনের সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদ–এর প্রথম অধিবেশনে তাকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
অধিবেশন চলাকালে সভাপতিত্ব করেন সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি জানান, স্পিকার পদে নির্বাচনের জন্য একটিমাত্র মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে এবং সেটি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ–এর। তিনি এ দায়িত্ব পালনে সম্মতি দিয়েছেন বলেও অধিবেশনে জানানো হয়।
এরপর প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম–কে আহ্বান জানানো হয়। নুরুল ইসলাম স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করেন এবং প্রস্তাবটি সমর্থন করেন সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম। প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে উত্থাপন করা হলে ‘হ্যাঁ’ ভোটে তা গৃহীত হয়। এর মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন
নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতি, ক্রীড়া ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। মহান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ–এ অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য তাকে রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব বীর বিক্রম প্রদান করা হয়।
রাজনীতিতে আসার আগেই ক্রীড়াক্ষেত্রেও তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় এবং এক সময় দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। ১৯৬৪ সাল থেকে পরপর তিনবার পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব (ফাস্টেস্ট ম্যান) হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
তার পারিবারিক পটভূমিও ছিল রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। তার বাবা ডা. আজহার উদ্দিন ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে দুই দফা পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর বাবার পথ অনুসরণ করেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
সংসদীয় রাজনীতিতে পথচলা
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা–৩ আসন থেকে প্রথমবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টি–এর প্রার্থী হিসেবে। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে তিনি টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এরশাদ সরকারের পতন–এর পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ‘পান’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোলা–৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটে জয়ী হন। সে নির্বাচনে তার কাছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে পরাজিত হন।
পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–তে যোগ দেন। এরপর বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন।
মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব
খালেদা জিয়া–র নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
-
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে ১৯ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ২৯ মার্চ ১৯৯৬ পর্যন্ত বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
-
অষ্টম জাতীয় সংসদে ১১ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২২ মে ২০০৩ পর্যন্ত পাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
-
পরবর্তীতে ২২ মে ২০০৩ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ভূমিকা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে তাকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে সংসদ সদস্যদের অনেকে মন্তব্য করেন।


















