আদানির সঙ্গে চুক্তি জাতীয় স্বার্থবিরোধী, বছরে বাড়তি নিচ্ছে ৫-৬ হাজার কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ০২:০৭:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৭ বার পড়া হয়েছে
২৫ বছরের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে এই কষ্ট মেনে নিতে হবে
অলস বসে থাকা ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতিবছর ৯০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে
চুক্তির বিপুল পরিমাণ প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেছে, যা দুর্নীতির শক্ত ইঙ্গিত দেয়। ইতোমধ্যে এসব তথ্য দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, উচ্চ আদালতেও জমা দেওয়া হয়েছে।
ভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাত নয়, পুরো অর্থনীতি একসময় ধসে পড়বে। এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে, এর দায় বইতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে
বিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে গত দেড় দশকে যে কাঠামোগত দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতির চিত্র তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিবছর বাংলাদেশকে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষে এই বাড়তি অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার, যা সরাসরি জাতীয় সম্পদের নিঃশেষ ঘটাবে।
কমিটি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০–এর অধীন সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছরের নভেম্বরে বিশেষ আইনটি রহিত করা হয়। বিশেষ আইনের অধীন করা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি ও চুক্তির প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে কমিটির প্রতিবেদনে।
হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী এ কমিটির আহ্বায়ক। সদস্যরা হলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও সহ-উপাচার্য আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আলী আশফাক, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অর্থনীতির অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। চুক্তিগুলো পুরোপুরি কারিগরি, তাই সময় লেগেছে। এর মধ্যে দুটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। একটি আদানি নিয়ে, অন্যটি সব চুক্তি পর্যালোচনা করে।
শুরুতে প্রতিবেদন নিয়ে সূচনা বক্তব্য দিতে গিয়ে বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত মুনাফার বিপুল সম্ভাবনা থাকায় যোগসাজশ, দুর্নীতি এবং চুক্তি বণ্টনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রলোভনও বেড়েছে। অতিরিক্ত দাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং চুক্তির নকশার মধ্যেই কাঠামোগতভাবে যুক্ত ছিল।
শাহদীন মালিক ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন জাহিদ হোসেন ও মোশতাক হোসেন খান।
প্রতিবেদনটি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় লিখিত বক্তব্য দিয়েছে আদানি। তারা দাবি করেছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন তারা পায়নি। বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের মতামত জানতে বা তথ্য নিতে যোগাযোগ করেনি। বিপুল বকেয়া থাকলেও তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেনি।

গঠিত কমিটির ভাষায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিদ্যুৎ খাতে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিপূর্ণ চুক্তি কাঠামোর ফল। যেখানে লাভ বেসরকারি ও বিদেশি কোম্পানির, আর ঝুঁকি পুরোপুরি রাষ্ট্র ও জনগণের ঘাড়ে। আদানির বিদ্যুৎ চুক্তিকে তারা আখ্যায়িত করেছে সবচেয়ে খারাপ চুক্তি হিসেবে, যেখান থেকে শুরু করলে অন্য সব অনৈতিক চুক্তির গিঁট খুলতে পারবে রাষ্ট্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যখন ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট, তখন আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয় ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে। শুধু তাই নয়, চুক্তিতে এমন এক অদ্ভূত মূল্যসূচক যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে আদানিকে বাজারমূল্যের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। এই অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ কোনো প্রযুক্তিগত প্রয়োজন নয়, বরং পরিকল্পিত আর্থিক সুবিধা প্রদানের কৌশল।
চুক্তির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ঝুঁকি বণ্টন। ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হলেও সেই ক্ষতির দায় নিতে হবে বাংলাদেশকে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের বাইরে, কিন্তু আর্থিক ও সরবরাহ ঝুঁকি পুরোপুরি বাংলাদেশের। জাতীয় কমিটি যথার্থভাবেই এই ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করেছে, লাভটা নিজের, ঝুঁকিটা সমাজের।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান নির্বাচন নিয়েও রয়েছে গুরুতর অনিয়ম। শুরুতে কক্সবাজারের মহেশখালী ও ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা, এই দুটি স্থান আলোচনায় থাকলেও কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা ছাড়াই গোড্ডাকে বেছে নেওয়া হয়। অথচ ঝাড়খণ্ডের কয়লা রপ্তানিযোগ্য নয়। ফলে সেখানে আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে, যা ব্যয় বাড়িয়েছে বহুগুণ, আর সেই ব্যয়ের ভার চাপানো হয়েছে বাংলাদেশের ওপর।
পর্যালোচনা কমিটির মতে, এমন চুক্তি দুর্নীতি ছাড়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বিপুল পরিমাণ প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেছে, যা দুর্নীতির শক্ত ইঙ্গিত দেয়। ইতোমধ্যে এসব তথ্য দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, উচ্চ আদালতেও জমা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ দুর্নীতি মামলার জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশেষজ্ঞ আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে, যারা আদানি চুক্তির তথ্য যাচাই করছে।
তবে কমিটি সতর্ক করে বলেছে, দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ ছাড়া সার্বভৌম চুক্তি বাতিল করা সম্ভব নয়। এ কারণেই সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত আন্তর্জাতিক সালিসি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিলম্ব হলে আইনি কারণে রাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।
কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের পথে গেলে স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হতে পারে, লোডশেডিং বাড়তে পারে। কিন্তু ২৫ বছরের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে এই কষ্ট মেনে নিতে হবে। দুই থেকে চার বছর ত্যাগ স্বীকার করলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি দেউলিয়াত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
প্রতিবেদন আরও জানায়, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণ, কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বেড়েছে ১১ গুণ। এর ফলাফল-বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এখন কার্যত দেউলিয়া। অলস বসে থাকা ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতিবছর ৯০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে।
জাতীয় কমিটির উপসংহার স্পষ্ট, বিদ্যুৎ খাতে এই চুক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেনি। বরং একটি সীমিত স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করেছে। ভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাত নয়, পুরো অর্থনীতি একসময় ধসে পড়বে। এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে, এর দায় বইতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।



















