ঢাকা ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চাউলের দাম বৃদ্ধির খবরে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রথানমন্ত্রীর নির্দেশ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ কেন অবৈধ নয় জানতে চেয়ে হাই কোর্টের রুল সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি নির্দেশনা দূতাবাসের ঈদযাত্রা ঘিরে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু, টার্মিনাল ও স্টেশনে ভিড় দুবাই ছাড়তে ধনকুবেরদের হুড়োহুড়ি, প্রাইভেট জেটের ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে গতি আনতে একমত ঢাকা-দিল্লি চাঁদাবাজি-ছিনতাই দমনে জিরো টলারেন্স: মাঠ পর্যায়ে কঠোর বার্তা আইজিপির কুয়েতে তিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, কারণ জানাল যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের ‘নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু আর নেই

The story of stealing mountains : এক পাহাড় চুরির গল্প

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০০:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ ৩৪৪ বার পড়া হয়েছে
ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছবি লেখক

মহুয়া দত্ত

লেদাবোনা নামটা কখনও শুনেছেন? শোনেননি। আচ্ছা, তাহলে তিলাবনি ? এটা কেমন চেনা চেনা ঠেকছে না? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন ,পুরুলিয়া জেলার একটা মৌজা। তিলাবনী আর কলাবনী দুই মৌজা নিয়ে এই পাথুরে অসমতল ভূমিতে সাঁওতাল, মাহাতো বিভিন্ন প্রাচীন জনজাতির বসবাস। তিলাবনী পাহাড় এই মানুষ গুলোর জীবনের সুখদুঃখ, হাসি কান্নার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিলাবনী মৌজা মোটামুটি ৩৩.৯১ একর জমি (গ্রামের মানুষের কথা অনুযায়ী) নিয়ে গঠিত। তিলাবনী পাহাড়কে ঘিরে রেখেছে আদিবাসী গ্রামগুলো।

পূর্বে লেদাবোনা, পশ্চিম দিকে মাধবপুর, উত্তরে পরাশিবোনা, দক্ষিণে তিলাবনী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক লিখে বোঝাতে পারব না হয়ত। স্হানীয় মানুষ দের কথায় ‘তাল’ থেকে তিলাবনী নাম টা এসেছে। আঁকাবাঁকা লালমাটি ,কাঁকর, পাথর বিছানো পথে যেতে যেতে তাল, খেজুর, পলাশ,মহুয়া, আপনাকে স্বাগত জানাবে। ছোটবড় জলাশয়, ছবির মতো আদিবাসী দের গ্রাম, ছোটো ছোটো শিশুদের জলকেলি, কলরব, সবই কেমন শহুরে বিবর্ন চোখে নতুন লাগবে।

আমার কাছেও তাই লেগেছিল। যেদিকে দুচোখ যায় ফাঁকা প্রান্তর আর দূরে বেশ কয়েকটা পাহাড়। আরে মালভূমি অঞ্চলে আস্ত পাহাড়? মনে হচ্ছিল গড়িটা খুব আস্তে চলছে , উফফফ আর কত যাবো রে বাবা, নামতে পারলে বাঁচি। আসলে আমাদের গন্তব্য ছিল ঠিক ওই পাহাড়েরই কোলে। জানতাম না। ভয়ঙ্কর ভাবে হেলেদুলে আরো বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আমরা পৌঁছলাম সেখানে। আমাদের জঈঈ (রক ক্লাইম্বিং কোর্স) ঈধসঢ় এ।

নব অরুনোদয় , তার ফলে প্রকৃতি উজ্জ্বল, শীতের চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ তিলাবনী সুন্দরী র। গরম চা খেতে খেতে আলাপ জুড়লাম। বেশ ভাব হলো আমাদের দুজনের। দিনচারেক থাকবো কিনা তাই একটু চোখাচোখি , মুচকি হাসি, সবই নীরবে চলতে লাগলো। কখনও আমি তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিই তো কখনও সে আমাকে। যাইহোক প্রেম জমে উঠলো। মনে হলো অদ্যিকালের চেনা । আমাদের রান্নাবান্না র কাজে অশোক হেমব্রম সাহায্য করছিলো। ওর থেকে তো কত গল্পই শুনলাম। বেশ প্রাণবন্ত ছেলে। তারপর একদিন সন্ধ্যায় ক্যাম্পের আড্ডায় শুনলাম সেই ভয়ঙ্কর গল্পটা। ভূতের নয় মোটেই।

গোটা তিলাবনী সুন্দরী কে লুটে নেওয়ার চেষ্টা। হ্যাঁ ঠিক বলছি। পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলন করে গাড়ী করে কলকাতায় চালান করা হয় বিভিন্ন নামী দামী মার্বেল ফ্যাক্টরি তে। গ্রানাইট সাপ্লাই দেয় বিভিন্ন নির্মাণ সংস্থা কে। আর এই কাজের জন্য গোটা পাহাড় টাকে লীজ দেওয়া হয় ১০ থেকে ১২ বছরের জন্য। সরকারের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের থেকে। তবে আইন শৃঙ্খলা র নামমাত্র বজায় না রেখে যথেচ্ছ ভাবে পাথর কাটে এই সব কোম্পানি। তাই কিছুদিনের মধ্যেই গোটা পাহাড় টা ছোট হতে শুরু করে। একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শুধুই পড়ে থাকে এবড়োখেবরো পাথুরে কঙ্কাল।

এমনই একবার এই সুন্দরী কে লুটেরা রা লুট করতে আসে। বাদসাধে গ্রামবাসী রা। তারা সবাই মিলে পাহাড়ে উঠে, কেউবা পাহাড়ের নীচে শুয়ে, অনশন শুরু করে। তাদের কাছে ‘বুরু’ (সাঁওতালি ভাষায় পাহাড়কে বলে) হলো পরম আত্মীয়, আপনার জন। ওরা প্রকৃতি মাতার সন্তান। তাই প্রকৃতি ওদের ‘গো’ (মা)।আর ‘দা’ (জল) হলো ওদের বাবা। ‘বাহা’ (ফুল) হলো স্বজন। তাই প্রকৃতির সম্পদ সর্বশক্তি দিয়ে ওরা রক্ষা করবে। পিছু হঠতে বাধ্য হয় সেই দুর্বিনীত অপরাধীর দল। বেঁচে যায় তিলাবনী বুরু। বেঁচে যায় প্রকৃতি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেলো বার্তা। প্রকৃতিকে বাঁচানোর অঙ্গীকার। সেদিন সেই আড্ডায় বসে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়েছিলো। ঘটনা র বিবরণ দিতে গিয়ে সেই ছেলেটি যে কতটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল চোখের সামনে দেখছিলাম। আর দেখেছিলাম আমাদের ক্যাম্পের ট্রেনি থেকে ইন্সট্রাক্টর সকলের ই চোয়াল শক্ত হওয়া, বুঝেছিলাম আমাদের এই অস্থায়ী সংসারের প্রত্যেক সদস্যরা কতটা প্রকৃতিপ্রেমী।

তাইতো আমরা পাহাড়ের জন্য কাঁদতে পারি। নদীর পাড়ে গাছ লাগিয়ে সুখ পাই। সমুদ্রের পাড়ে জমে থাকা জঞ্জাল সাফ করতে কোমড় বাঁধি। জঙ্গল কাটতে এলেই ঝগড়া করি। পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়েও ক্লান্ত বোধ করিনা। আসুন না আমাদের মতো পাগলদের সাহায্য করতে। শহুরে বদনাম ঘোচাতে। সবাই ভালো থাকবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

The story of stealing mountains : এক পাহাড় চুরির গল্প

আপডেট সময় : ১১:০০:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২

ছবি লেখক

মহুয়া দত্ত

লেদাবোনা নামটা কখনও শুনেছেন? শোনেননি। আচ্ছা, তাহলে তিলাবনি ? এটা কেমন চেনা চেনা ঠেকছে না? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন ,পুরুলিয়া জেলার একটা মৌজা। তিলাবনী আর কলাবনী দুই মৌজা নিয়ে এই পাথুরে অসমতল ভূমিতে সাঁওতাল, মাহাতো বিভিন্ন প্রাচীন জনজাতির বসবাস। তিলাবনী পাহাড় এই মানুষ গুলোর জীবনের সুখদুঃখ, হাসি কান্নার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিলাবনী মৌজা মোটামুটি ৩৩.৯১ একর জমি (গ্রামের মানুষের কথা অনুযায়ী) নিয়ে গঠিত। তিলাবনী পাহাড়কে ঘিরে রেখেছে আদিবাসী গ্রামগুলো।

পূর্বে লেদাবোনা, পশ্চিম দিকে মাধবপুর, উত্তরে পরাশিবোনা, দক্ষিণে তিলাবনী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক লিখে বোঝাতে পারব না হয়ত। স্হানীয় মানুষ দের কথায় ‘তাল’ থেকে তিলাবনী নাম টা এসেছে। আঁকাবাঁকা লালমাটি ,কাঁকর, পাথর বিছানো পথে যেতে যেতে তাল, খেজুর, পলাশ,মহুয়া, আপনাকে স্বাগত জানাবে। ছোটবড় জলাশয়, ছবির মতো আদিবাসী দের গ্রাম, ছোটো ছোটো শিশুদের জলকেলি, কলরব, সবই কেমন শহুরে বিবর্ন চোখে নতুন লাগবে।

আমার কাছেও তাই লেগেছিল। যেদিকে দুচোখ যায় ফাঁকা প্রান্তর আর দূরে বেশ কয়েকটা পাহাড়। আরে মালভূমি অঞ্চলে আস্ত পাহাড়? মনে হচ্ছিল গড়িটা খুব আস্তে চলছে , উফফফ আর কত যাবো রে বাবা, নামতে পারলে বাঁচি। আসলে আমাদের গন্তব্য ছিল ঠিক ওই পাহাড়েরই কোলে। জানতাম না। ভয়ঙ্কর ভাবে হেলেদুলে আরো বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আমরা পৌঁছলাম সেখানে। আমাদের জঈঈ (রক ক্লাইম্বিং কোর্স) ঈধসঢ় এ।

নব অরুনোদয় , তার ফলে প্রকৃতি উজ্জ্বল, শীতের চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ তিলাবনী সুন্দরী র। গরম চা খেতে খেতে আলাপ জুড়লাম। বেশ ভাব হলো আমাদের দুজনের। দিনচারেক থাকবো কিনা তাই একটু চোখাচোখি , মুচকি হাসি, সবই নীরবে চলতে লাগলো। কখনও আমি তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিই তো কখনও সে আমাকে। যাইহোক প্রেম জমে উঠলো। মনে হলো অদ্যিকালের চেনা । আমাদের রান্নাবান্না র কাজে অশোক হেমব্রম সাহায্য করছিলো। ওর থেকে তো কত গল্পই শুনলাম। বেশ প্রাণবন্ত ছেলে। তারপর একদিন সন্ধ্যায় ক্যাম্পের আড্ডায় শুনলাম সেই ভয়ঙ্কর গল্পটা। ভূতের নয় মোটেই।

গোটা তিলাবনী সুন্দরী কে লুটে নেওয়ার চেষ্টা। হ্যাঁ ঠিক বলছি। পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলন করে গাড়ী করে কলকাতায় চালান করা হয় বিভিন্ন নামী দামী মার্বেল ফ্যাক্টরি তে। গ্রানাইট সাপ্লাই দেয় বিভিন্ন নির্মাণ সংস্থা কে। আর এই কাজের জন্য গোটা পাহাড় টাকে লীজ দেওয়া হয় ১০ থেকে ১২ বছরের জন্য। সরকারের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের থেকে। তবে আইন শৃঙ্খলা র নামমাত্র বজায় না রেখে যথেচ্ছ ভাবে পাথর কাটে এই সব কোম্পানি। তাই কিছুদিনের মধ্যেই গোটা পাহাড় টা ছোট হতে শুরু করে। একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শুধুই পড়ে থাকে এবড়োখেবরো পাথুরে কঙ্কাল।

এমনই একবার এই সুন্দরী কে লুটেরা রা লুট করতে আসে। বাদসাধে গ্রামবাসী রা। তারা সবাই মিলে পাহাড়ে উঠে, কেউবা পাহাড়ের নীচে শুয়ে, অনশন শুরু করে। তাদের কাছে ‘বুরু’ (সাঁওতালি ভাষায় পাহাড়কে বলে) হলো পরম আত্মীয়, আপনার জন। ওরা প্রকৃতি মাতার সন্তান। তাই প্রকৃতি ওদের ‘গো’ (মা)।আর ‘দা’ (জল) হলো ওদের বাবা। ‘বাহা’ (ফুল) হলো স্বজন। তাই প্রকৃতির সম্পদ সর্বশক্তি দিয়ে ওরা রক্ষা করবে। পিছু হঠতে বাধ্য হয় সেই দুর্বিনীত অপরাধীর দল। বেঁচে যায় তিলাবনী বুরু। বেঁচে যায় প্রকৃতি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেলো বার্তা। প্রকৃতিকে বাঁচানোর অঙ্গীকার। সেদিন সেই আড্ডায় বসে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়েছিলো। ঘটনা র বিবরণ দিতে গিয়ে সেই ছেলেটি যে কতটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল চোখের সামনে দেখছিলাম। আর দেখেছিলাম আমাদের ক্যাম্পের ট্রেনি থেকে ইন্সট্রাক্টর সকলের ই চোয়াল শক্ত হওয়া, বুঝেছিলাম আমাদের এই অস্থায়ী সংসারের প্রত্যেক সদস্যরা কতটা প্রকৃতিপ্রেমী।

তাইতো আমরা পাহাড়ের জন্য কাঁদতে পারি। নদীর পাড়ে গাছ লাগিয়ে সুখ পাই। সমুদ্রের পাড়ে জমে থাকা জঞ্জাল সাফ করতে কোমড় বাঁধি। জঙ্গল কাটতে এলেই ঝগড়া করি। পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়েও ক্লান্ত বোধ করিনা। আসুন না আমাদের মতো পাগলদের সাহায্য করতে। শহুরে বদনাম ঘোচাতে। সবাই ভালো থাকবেন।