বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন সামাজিক নিরাপত্তায় ধনীরা পান বেশি, বাদ পড়ছে অর্ধেক দরিদ্র
- আপডেট সময় : ০৭:০৬:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৬০ বার পড়া হয়েছে
বছরে দরিদ্রের সুবিধা ৭১৪০, ধনীর ১০ হাজার ৪৭২ টাকা ॥ ৬২ শতাংশ দরিদ্র প্রধান কর্মসূচির বাইরে ॥ বিদ্যুৎ ভর্তুকির ৩৩ শতাংশ যায় শীর্ষ ২০ শতাংশের পেছনে ॥ সারে ভর্তুকি বেড়েছে চার গুণ
দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের একটি বড় অংশ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকলেও তুলনামূলক ধনী জনগোষ্ঠীও এসব কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছে। এমনকি বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে দরিদ্র মানুষ যেখানে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকার সুবিধা পান, সেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান ১০ হাজার ৪৭২ টাকা। ফলে দরিদ্র মানুষের জন্য নির্ধারিত সরকারি সহায়তার বড় একটি অংশ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, ভর্তুকি, কৃষি এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থাটির অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান ও ধ্রুব শর্মা।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে মাত্র ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরাসরি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক দরিদ্র পরিবারই কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ৩১ শতাংশ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। এর ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ফ্যামিলি কার্ডে বড় সম্ভাবনা
দরিদ্র মানুষের কাছে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারলে ফ্যামিলি কার্ড দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে এই কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া গেলে বছরে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলা সম্ভব।
এ জন্য দরিদ্রতা নিরূপণের স্বীকৃত মানদণ্ড ব্যবহার, নগদ সহায়তা কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ, খাদ্যসহায়তার তালিকা পুনর্বিন্যাস এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর সংযোগ স্থাপনের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষকে খাবার কিনতেই তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। কৃষি খাতে ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় হলেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবেন। তবে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের চিহ্নিত করে কার্ড দেওয়া গেলে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখে উন্নীত হতে পারে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকির বড় অংশ ধনীদের
সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ভর্তুকিতেও ধনী–গরিবের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির মাত্র ১৫ শতাংশের কিছু বেশি সুবিধা পান। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান মোট ভর্তুকির প্রায় ৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ ধনী জনগোষ্ঠীর পেছনেই বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় এক–তৃতীয়াংশ ব্যয় হচ্ছে।

সারে ভর্তুকি বেড়েছে চার গুণ
কৃষি খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও ব্যয়ের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯–২০ অর্থবছরে সারে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে সারে ভর্তুকি বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই ভর্তুকিতে ব্যয় করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ অবস্থায় কৃষি খাতে ভর্তুকির পাশাপাশি গবেষণা, সম্প্রসারণ, মাটি পরীক্ষা, বাজারজাতকরণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ছোট ও ঝুঁকির মুখে থাকা কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
দারিদ্র্য বেড়েছে, থমকে কর্মসংস্থান
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির কথাও উঠে এসেছে। জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবে টানা চতুর্থ বছরের মতো দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে
