ঢাকা ০৯:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রী বাসভবনের সৌরবিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে ১২শ ইউনিট সরবরাহ শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে: দীনেশ ত্রিবেদী ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজের ছবি শেয়ার করেন প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু হাসপাতালে ভর্তি ১,৬০৮ স্কুলে যাওয়ার বাধা দূর হলো তুবা-অয়ন মিত্রের থানা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগের নজির বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ফেনীতে ১,৫৪২ কোটি টাকার মুহুরী-কহুয়া প্রকল্প সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারে ১০ দিনের আল্টিমেটাম ক্র্যাবের কফির উৎপাদন বাড়লেও চাষ ও বাজারজাতকরণে সংকট শাশ্বতী গুহ’র কবিতা ‘আজও আমার কিছু বলার ছিল’ দখল-ভাঙচুরে ছাড় নয়, জাইমার নিয়োগেও সম্পৃক্ততা নেই সরকারের

স্কুলে যাওয়ার বাধা দূর হলো তুবা-অয়ন মিত্রের থানা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগের নজির

আমিনুল হক ভূইয়া
  • আপডেট সময় : ০৬:০৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে

থানা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগের নজির :ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন নিজের দায়িত্বের সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে যুক্ত করেন, তখন তাঁর একটি ছোট উদ্যোগও একটি শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে

একটি শিশুর কাছে স্কুল মানে শুধু বই-খাতা, সহপাঠী আর শিক্ষকের সান্নিধ্য নয়, স্কুল মানে তার স্বপ্ন দেখার জায়গা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের সংকট, কখনো সমাজের নির্মমতা, আবার কখনো অসহায়ত্বের দীর্ঘ ছায়া।

বরিশালের উজিরপুরে দুই শিশুর জীবনে এমনই দু’টি ভিন্ন সংকট তৈরি হয়েছিল। একজন সামাজিক অপবাদ ও পারিবারিক সংকটে হারাতে বসেছিল বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ।

অন্যজন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছিল না। দুজনের জীবনেই আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।

শত্রুতার জেরে তুবার বাবাকে চোর অপবাদ দিয়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার অভিযোগ ওঠে। রাতভর এমন অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে কাটে তাঁর। সেই রাতে ঘুমাতে পারেনি ছোট্ট তুবাও। ভোরে খবর পেয়ে বাবার কাছে ছুটে যায় সে। ক্ষুধাকাতর বাবা খাবার চাইলে পাশের একটি দোকানে ছুটে যায় তুবা। সেখান থেকে চা ও বনরুটি এনে চায়ে রুটি ভিজিয়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দেয়।

শিশুর ছোট্ট হাতের সেই দৃশ্যটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুহূর্তেই আলোচনায় আসে উজিরপুরের বামরাইলের শিশু তুবা বিনতে অরনি। কিন্তু যে দৃশ্য মানুষের চোখে জল এনেছিল, সেই ঘটনার পরই তুবার পরিবারকে পড়তে হয় কঠিন সামাজিক সংকটে। সামাজিক অপবাদ ও নানা প্রতিকূলতায় তুবার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

একটি শিশুর অপরাধ কী বাবার পাশে দাঁড়ানো? অসহায় বাবাকে একটু চা-রুটি খাইয়ে দেওয়া? প্রশ্নটি হয়তো তুবা করতে পারেনি। কিন্তু তার স্কুলে যাওয়ার পথ যে বন্ধ হয়ে গেছে, সেটি বুঝতে পেরেছিলেন ইউএনও মো. আলী সুজা।

বিষয়টি জানতে পেরে তিনি নিজেই ছুটে যান তুবাদের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তুবার সঙ্গে কথা বলেন। এরপর শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি পৌঁছে দেন বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

শুধু বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। তুবার পড়াশোনা যেন আর কোনো সামাজিক বা পারিবারিক সংকটে থেমে না যায়, সে দায়িত্বও নেওয়ার উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তুবার মাদকাসক্ত বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থার উদ্যোগ নেন তিনি।

একজন শিশুর ভবিষ্যৎকে তার পরিবারের সংকট কিংবা সমাজের অপবাদ দিয়ে আটকে দেওয়া যায় না, এই বার্তাটিই যেন তাঁর উদ্যোগে ফুটে ওঠে।

তুবার গল্প যখন মানবিকতার কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই একই উপজেলার আরেক শিশুর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন ইউএনও মো. আলী সুজা।

স্কুলে যাওয়ার বাধা দূর হলো তুবা-অয়ন মিত্রের
থানা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগের নজির ছবি সংগ্রহ

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে উত্তর রাখালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অয়ন মিত্র নিয়মিত চলাফেরা করতে পারছিলো না। বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা তার জন্য ছিল কষ্টকর।

অন্য শিশুদের মতো প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে আটকে রাখছিল।

অয়নের এই অসুবিধার কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেয় ইচলাদী যুবসমাজ অগ্রযাত্রা সামাজিক যুব সংগঠন। বিষয়টি জানার পর অয়নের জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন ইউএনও। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামের সহযোগিতায় অয়নের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় হুইলচেয়ার।

হুইলচেয়ারটি হয়তো একটি সাধারণ উপকরণ। কিন্তু অয়নের কাছে এটি কেবল চলাচলের যন্ত্র নয়, এটি তার স্কুলে ফেরার পথ, সহপাঠীদের কাছে যাওয়ার সুযোগ, নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি অবলম্বন।

দুই শিশুর গল্প আলাদা। তুবার বাধা ছিল সামাজিক সংকট ও পরিবারের দুর্দশা, অয়নের বাধা ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু দুজনের প্রয়োজন ছিল একই একটু সহায়তা, একটু মানবিকতা, আর এমন একজন মানুষ, যিনি সমস্যাটিকে দূর থেকে দেখবেন না, কাছে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করবেন।

মিথ্যা অপবাদের বোঝায় ভারাক্রান্ত একটি শিশুর জীবনকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে দেওয়া এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় আটকে থাকা আরেক শিশুর হাতে স্কুলে যাওয়ার উপায় তুলে দেওয়া দুটি ঘটনাই যেন একই মানবিক বার্তা দেয়। সরকারি দায়িত্ব শুধু কাগজপত্র, দাপ্তরিক সভা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোও সেই দায়িত্বের অংশ।

তুবার বাবাকে যখন অপমান আর অসহায়তার মধ্যে রাত কাটাতে হয়েছিল, তখন ছোট্ট তুবার হাতে ছিল না কোনো ক্ষমতা, ছিল না কোনো প্রতিবাদের ভাষা। ছিল শুধু বাবার প্রতি ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই ভোরে বাবার মুখে চা-রুটি তুলে দিয়েছিল সে। আর সেই শিশুটিই যখন সমাজের নানা প্রতিকূলতায় স্কুল হারাতে বসেছিল, তখন একজন সরকারি কর্মকর্তা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।

অয়নও হয়তো একদিন অন্য শিশুদের মতো সহজে স্কুলের পথে যেতে চাইত। একটি হুইলচেয়ার সেই পথটুকু সহজ করে দিয়েছে।

এই দুই শিশুর মুখে আবার স্কুলের হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মো. আলী সুজা শুধু দুটি পরিবারের পাশে দাঁড়াননি, তিনি যেন সমাজকে একটি সরল অথচ গভীর শিক্ষা দিয়েছেন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কোনো অপবাদ, অসহায়ত্ব কিংবা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানতে পারে না।

এমন উদ্যোগকে শুধু ‘মানবিকতা’ বলে শেষ করে দেওয়া যায় না। কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন নিজের দায়িত্বের সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে যুক্ত করেন, তখন তাঁর একটি ছোট উদ্যোগও একটি শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

তুবার স্কুলে ফেরার পথ খুলেছে। অয়নের চলার পথ হয়েছে সহজ। দুজনের চোখেই হয়তো এখন আবার আগামী দিনের স্বপ্ন।

আর এই দুই শিশুর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিচয় বড় বড় কথায় নয়, একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মুহূর্তো। একজন শিশুর হাত ধরে তাকে আবার স্কুলের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

স্কুলে যাওয়ার বাধা দূর হলো তুবা-অয়ন মিত্রের থানা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগের নজির

আপডেট সময় : ০৬:০৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন নিজের দায়িত্বের সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে যুক্ত করেন, তখন তাঁর একটি ছোট উদ্যোগও একটি শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে

একটি শিশুর কাছে স্কুল মানে শুধু বই-খাতা, সহপাঠী আর শিক্ষকের সান্নিধ্য নয়, স্কুল মানে তার স্বপ্ন দেখার জায়গা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের সংকট, কখনো সমাজের নির্মমতা, আবার কখনো অসহায়ত্বের দীর্ঘ ছায়া।

বরিশালের উজিরপুরে দুই শিশুর জীবনে এমনই দু’টি ভিন্ন সংকট তৈরি হয়েছিল। একজন সামাজিক অপবাদ ও পারিবারিক সংকটে হারাতে বসেছিল বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ।

অন্যজন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছিল না। দুজনের জীবনেই আশার আলো হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।

শত্রুতার জেরে তুবার বাবাকে চোর অপবাদ দিয়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার অভিযোগ ওঠে। রাতভর এমন অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে কাটে তাঁর। সেই রাতে ঘুমাতে পারেনি ছোট্ট তুবাও। ভোরে খবর পেয়ে বাবার কাছে ছুটে যায় সে। ক্ষুধাকাতর বাবা খাবার চাইলে পাশের একটি দোকানে ছুটে যায় তুবা। সেখান থেকে চা ও বনরুটি এনে চায়ে রুটি ভিজিয়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দেয়।

শিশুর ছোট্ট হাতের সেই দৃশ্যটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুহূর্তেই আলোচনায় আসে উজিরপুরের বামরাইলের শিশু তুবা বিনতে অরনি। কিন্তু যে দৃশ্য মানুষের চোখে জল এনেছিল, সেই ঘটনার পরই তুবার পরিবারকে পড়তে হয় কঠিন সামাজিক সংকটে। সামাজিক অপবাদ ও নানা প্রতিকূলতায় তুবার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

একটি শিশুর অপরাধ কী বাবার পাশে দাঁড়ানো? অসহায় বাবাকে একটু চা-রুটি খাইয়ে দেওয়া? প্রশ্নটি হয়তো তুবা করতে পারেনি। কিন্তু তার স্কুলে যাওয়ার পথ যে বন্ধ হয়ে গেছে, সেটি বুঝতে পেরেছিলেন ইউএনও মো. আলী সুজা।

বিষয়টি জানতে পেরে তিনি নিজেই ছুটে যান তুবাদের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তুবার সঙ্গে কথা বলেন। এরপর শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি পৌঁছে দেন বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

শুধু বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। তুবার পড়াশোনা যেন আর কোনো সামাজিক বা পারিবারিক সংকটে থেমে না যায়, সে দায়িত্বও নেওয়ার উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তুবার মাদকাসক্ত বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থার উদ্যোগ নেন তিনি।

একজন শিশুর ভবিষ্যৎকে তার পরিবারের সংকট কিংবা সমাজের অপবাদ দিয়ে আটকে দেওয়া যায় না, এই বার্তাটিই যেন তাঁর উদ্যোগে ফুটে ওঠে।

তুবার গল্প যখন মানবিকতার কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই একই উপজেলার আরেক শিশুর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন ইউএনও মো. আলী সুজা।

স্কুলে যাওয়ার বাধা দূর হলো তুবা-অয়ন মিত্রের
থানা নির্বাহী কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগের নজির ছবি সংগ্রহ

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে উত্তর রাখালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অয়ন মিত্র নিয়মিত চলাফেরা করতে পারছিলো না। বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা তার জন্য ছিল কষ্টকর।

অন্য শিশুদের মতো প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে আটকে রাখছিল।

অয়নের এই অসুবিধার কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেয় ইচলাদী যুবসমাজ অগ্রযাত্রা সামাজিক যুব সংগঠন। বিষয়টি জানার পর অয়নের জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন ইউএনও। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামের সহযোগিতায় অয়নের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় হুইলচেয়ার।

হুইলচেয়ারটি হয়তো একটি সাধারণ উপকরণ। কিন্তু অয়নের কাছে এটি কেবল চলাচলের যন্ত্র নয়, এটি তার স্কুলে ফেরার পথ, সহপাঠীদের কাছে যাওয়ার সুযোগ, নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি অবলম্বন।

দুই শিশুর গল্প আলাদা। তুবার বাধা ছিল সামাজিক সংকট ও পরিবারের দুর্দশা, অয়নের বাধা ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু দুজনের প্রয়োজন ছিল একই একটু সহায়তা, একটু মানবিকতা, আর এমন একজন মানুষ, যিনি সমস্যাটিকে দূর থেকে দেখবেন না, কাছে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করবেন।

মিথ্যা অপবাদের বোঝায় ভারাক্রান্ত একটি শিশুর জীবনকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে দেওয়া এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় আটকে থাকা আরেক শিশুর হাতে স্কুলে যাওয়ার উপায় তুলে দেওয়া দুটি ঘটনাই যেন একই মানবিক বার্তা দেয়। সরকারি দায়িত্ব শুধু কাগজপত্র, দাপ্তরিক সভা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোও সেই দায়িত্বের অংশ।

তুবার বাবাকে যখন অপমান আর অসহায়তার মধ্যে রাত কাটাতে হয়েছিল, তখন ছোট্ট তুবার হাতে ছিল না কোনো ক্ষমতা, ছিল না কোনো প্রতিবাদের ভাষা। ছিল শুধু বাবার প্রতি ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই ভোরে বাবার মুখে চা-রুটি তুলে দিয়েছিল সে। আর সেই শিশুটিই যখন সমাজের নানা প্রতিকূলতায় স্কুল হারাতে বসেছিল, তখন একজন সরকারি কর্মকর্তা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।

অয়নও হয়তো একদিন অন্য শিশুদের মতো সহজে স্কুলের পথে যেতে চাইত। একটি হুইলচেয়ার সেই পথটুকু সহজ করে দিয়েছে।

এই দুই শিশুর মুখে আবার স্কুলের হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মো. আলী সুজা শুধু দুটি পরিবারের পাশে দাঁড়াননি, তিনি যেন সমাজকে একটি সরল অথচ গভীর শিক্ষা দিয়েছেন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কোনো অপবাদ, অসহায়ত্ব কিংবা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানতে পারে না।

এমন উদ্যোগকে শুধু ‘মানবিকতা’ বলে শেষ করে দেওয়া যায় না। কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন নিজের দায়িত্বের সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে যুক্ত করেন, তখন তাঁর একটি ছোট উদ্যোগও একটি শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

তুবার স্কুলে ফেরার পথ খুলেছে। অয়নের চলার পথ হয়েছে সহজ। দুজনের চোখেই হয়তো এখন আবার আগামী দিনের স্বপ্ন।

আর এই দুই শিশুর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরিচয় বড় বড় কথায় নয়, একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মুহূর্তো। একজন শিশুর হাত ধরে তাকে আবার স্কুলের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই।