হিমালয় থেকে নেমে এলো মৃত্যুর স্রোত: নেপালে বন্যায় মৃত্যু ৩৮৯, নিখোঁজ প্রায় হাজার
- আপডেট সময় : ০৯:০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
শত শত বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী নিখোঁজ, নতুন বন্যার শঙ্কা
হিমালয়ের পাদদেশে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। বুধবারের এই ভয়াবহ দুর্যোগে গ্রাম, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সীমান্ত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
শুক্রবারের সর্বশেষ রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে মৃতের সংখ্যা ৩৮৯ জনে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারী দলগুলো কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধানে ভারী যন্ত্রপাতি, হেলিকপ্টার ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করছে। তবে দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক-সেতু এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিখোঁজ শত শত পর্যটক
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির হিসাবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ৮২৬ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা ৫৯০-এর মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশি এবং ১১৪ জন নেপালি।

নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তালিকায় ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া কানাডা, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের নিখোঁজদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪, নেপাল পুলিশের ২৮ এবং আর্মড পুলিশ ফোর্সের ১৩ সদস্যও রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন। কর্তৃপক্ষ মৃত ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে স্বজনদের তথ্য সংগ্রহ করছে।
তিব্বতেও ভয়াবহ বিপর্যয়
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
গিরংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবন্দরটি কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সীমান্তের অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।

যেভাবে শুরু হলো ভয়াবহ বন্যা
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস বা আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ নদীতে আছড়ে পড়ে। এর ফলে লহেন্দে খোলা নদীতে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি একসঙ্গে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাত্মক কাদাপ্রবাহে পরিণত হয়।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, প্রাথমিকভাবে যে ভূকম্পন শনাক্ত হয়েছিল, সেটি সম্ভবত ভূমিকম্প নয়; বরং হিমবাহ ও শিলার বিশাল ধসের ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও শিলাস্তরের অস্থিতিশীলতা এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি, বরফ গলা এবং পাহাড়ের জমাট স্তরের পরিবর্তন বড় ধরনের হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে এই নির্দিষ্ট ঘটনার একমাত্র তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
নদীর পানি বেড়েছে কয়েক মিটার
হিমবাহ ধসের পর তৈরি হওয়া পানির প্রবল স্রোত প্রথমে লহেন্দে খোলা নদী দিয়ে নেমে আসে। পরে তা ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবল স্রোত রাস্তাঘাট, সেতু, ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অন্তত ১৯টি সেতু ও প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে।
নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া বহু মরদেহ নেপালের পার্বত্য এলাকা থেকে নিচের সমতল জেলার দিকে চলে গেছে। চিতওয়ান জেলার প্রশাসক জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকায় নদী ব্যবস্থায় শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জায়গার সংকট দেখা দেওয়ায় মরদেহ শনাক্ত ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
নতুন বন্যার আশঙ্কা
প্রথম ধাক্কা সামলানোর আগেই নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে নদীর প্রবাহ আটকে নেপালের ভুটেকোশি নদীর কাছে একটি হ্রদসদৃশ জলাধার তৈরি হয়েছে। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় সেটি ভেঙে গেলে আবারও ভয়াবহ বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
চীনের পক্ষ থেকেও তিব্বতে একই ধরনের ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে। দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি একটি ইতোমধ্যে বাধাগ্রস্ত জলাধারে প্রবেশ করতে পারে। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখের দিকে সেখানে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাঁধসদৃশ প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে নতুন বন্যা দেখা দিতে পারে।

চলছে সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। হেলিকপ্টারে করে দুর্গম এলাকায় খাবার, পানি ও জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বহু সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থলপথে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বলেছেন, সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হলো প্রতিটি মানুষের জীবন রক্ষা, নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক ত্রাণ নিশ্চিত করা।
কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রীরাও বিপদে
এই বিপর্যয়ের শিকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ছিলেন কৈলাস-মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রী ও পর্যটক। নেপাল হয়ে তিব্বতে প্রবেশের এই পথটি প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রী ও ট্রেকারের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান রুট।
নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বহু দেশের নাগরিক রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, তাঁর দেশের অন্তত ৩৪ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
নেপাল ও তিব্বতের এই ভয়াবহ দুর্যোগে তাই শুধু প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন ও তীর্থযাত্রার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
উদ্ধারকারীরা এখন ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান এবং নিখোঁজদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই কমে আসছে। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকর্মীদেরও সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।



















