আইএমএফের পূর্বাভাস ২০৩০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া-ভিয়েতনাম-থাইল্যান্ডকে ছাড়াবে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৬:৪৯:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ হিসাবে অর্থনীতির আকারে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ।
কানাডাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের ‘দ্য ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার গ্লোবাল ইকোনমি ইন ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ৬৭২ দশমিক ৫ বিলিয়ন, ভিয়েতনামের ৬৬৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং থাইল্যান্ডের ৬৪৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনীতির আকারে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
এই পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত। বিশেষ করে বৃহৎ জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার, তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয়, রপ্তানি খাত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং এবং হালকা প্রকৌশল খাতকে আরও শক্তিশালী করা গেলে রপ্তানির পরিধি বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বাড়ানো গেলে দেশের উৎপাদনশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানো গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
তবে শুধু জিডিপির আকার বাড়লেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া মাথাপিছু আয়, জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার গুণগত উন্নয়ন এবং আয়বৈষম্য কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার পাশাপাশি সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোই হবে মূল সাফল্যের মাপকাঠি।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তনের আভাস
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে। এ সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির মোট আকার ১৫০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তখনও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে শীর্ষে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির জিডিপি প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের অর্থনীতির আকার হতে পারে প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
তৃতীয় অবস্থান নিয়ে জার্মানি ও ভারতের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার আভাস দিয়েছে পূর্বাভাস। ২০৩০ সালে জার্মানি, ভারত ও যুক্তরাজ্যের জিডিপি যথাক্রমে প্রায় ৬ হাজার ১৭৮, ৬ হাজার ১৭৩ ও ৫ হাজার ১৪৮ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। অর্থাৎ জার্মানি ও ভারতের অর্থনীতির ব্যবধান মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে।
বিশ্বের পাঁচ বৃহত্তম অর্থনীতি মিলেই বৈশ্বিক জিডিপির ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎপাদন করবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাপান, ফ্রান্স, ব্রাজিল, ইতালি ও কানাডা বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির মধ্যে থাকবে।
সব মিলিয়ে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি, সুশাসন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। অর্থনীতির আকারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনমানেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারলেই এই অর্জন হবে আরও অর্থবহ।



















