খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আশার আলো ১০ হাজার কর্মীর ‘জিরো কস্ট’ যাত্রায়
- আপডেট সময় : ১০:০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া।
এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্টে’ মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি মিলেছে।
বিমানভাড়াসহ অভিবাসন-সংক্রান্ত ব্যয় ছাড়াই সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে এসব কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোকে ঘিরে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, দালালচক্র, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল।
ফলে এবার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছতা, কম অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি নির্বাচন করেছে। পাশাপাশি আরও ৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে।
সব মিলিয়ে ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি এজেন্সিগুলো যাচাই-বাছাই করেছে।
তবে নতুন করে শ্রমবাজার খোলার খবরে আশার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে সতর্কতার প্রয়োজনও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্র।
অতীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অস্বাভাবিক অভিবাসন ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ থাকায় এবার প্রশাসনকে শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি করতে হবে। কোন এজেন্সি কত টাকা নিতে পারবে, কর্মী বাছাই কীভাবে হবে, মেডিকেল ও ভিসা প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে, প্রতিটি ধাপেই ডিজিটাল ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বৈধভাবে বিপুলসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় গেলে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের পরিবারগুলোর আয় ও জীবনমান বাড়বে।
নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মীদের বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরি হলে দেশে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের চাহিদাও বাড়বে।

কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এবার গুরুত্ব পাচ্ছে। বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কাজে যোগদান, নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে সরকার। অভিবাসন-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত সমাধানে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো আর্থিক লেনদেন, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে না। ফলে মালয়েশিয়া যাওয়ার আশায় থাকা কর্মীদের এখনই দালালের কথায় টাকা না দিয়ে সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষা করতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে মালয়েশিয়ার এই নতুন উদ্যোগ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
১০ হাজার কর্মীর ‘জিরো কস্ট’ যাত্রা সফল হলে তা ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে কম খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানোর দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। আর সেই সাফল্যের সুফল শুধু প্রবাসী কর্মী বা তাদের পরিবার নয়, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই পেতে পারে।



















