বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রতিদিন ২৪২ জনের মৃত্যু, বছরে ২৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি: গবেষণা
- আপডেট সময় : ০১:৪৫:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ ৩৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের বাতাস ক্রমেই হয়ে উঠছে নীরব ঘাতক। চোখে দেখা যায় না এমন অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা (পিএম২.৫) প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ মানুষের অকালমৃত্যুর পেছনে দায়ী এই বায়ুদূষণ। শুধু প্রাণহানিই নয়, কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশ, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় পাঁচ শতাংশের সমান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ক্লাইমেট চেইঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ইউনিটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Pollution সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—এই ছয়টি প্রধান শহরের ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের বায়ুদূষণের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকাই সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। শুধু ঢাকাতেই বছরে প্রায় ৬৮ হাজার ৭০৩ মানুষের অকালমৃত্যু পিএম২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। চট্টগ্রামে এই সংখ্যা ১১ হাজার ২০২, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫। গবেষকদের মতে, ঢাকায় প্রতি বছর গড়ে আরও প্রায় সাড়ে তিন হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু ঘটছে বায়ুমানের অবনতির কারণে, যা নগরজীবনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এই সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে অবহেলা, ইটভাটার দূষণ, শিল্পকারখানার নির্গমন, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, দীর্ঘস্থায়ী যানজট, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে দেশের বড় শহরগুলো বিষাক্ত বায়ুর ফাঁদে আটকা পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির আস্তরণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন হৃদরোগে—প্রায় ৩৭ হাজার ৫১৯ জন। দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে মারা যাচ্ছেন ৮ হাজার ৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ৮১১ জন। অর্থাৎ বায়ুদূষণ এখন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
গবেষক দলের প্রধান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু এবং জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা।

তবে গবেষণাটি আশার কথাও বলছে। গবেষকদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুমান নির্দেশিকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, পিএম২.৫ নির্গমন কমাতে কঠোর নীতি গ্রহণ, অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানায় আধুনিক নির্গমন প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণস্থলে ধুলা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সবুজায়ন বাড়ানো গেলে অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণেরও এক ভয়াবহ দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি। এ অবস্থায় কার্যকর নীতি, কঠোর বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা ছাড়া এই নীরব ঘাতকের থাবা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করা কঠিন হবে। তাই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণকে আর পরিবেশের সীমিত ইস্যু হিসেবে নয়, বরং জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার সময় এসেছে।



















