বিমানের এমডির বাসায় শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন: মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
- আপডেট সময় : ০৮:৫০:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
১১ বছর বয়সী একটি শিশুকে গৃহকর্মীর নামে বাসায় এনে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের অভিযোগ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিকুর রহমানের বাসায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ভেতরের অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং শিশু অধিকার সুরক্ষার চরম ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর রয়েছে নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার, শিক্ষা লাভের এবং শোষণ ও নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ‘হালকা কাজ’-এর নামে বাসাবাড়িতে এনে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। ১১ বছরের একটি শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োগ করাই যেখানে মানবাধিকারের লঙ্ঘন, সেখানে তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে নির্যাতনের শিকার করা সরাসরি শিশু অধিকার পদদলনের শামিল।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে একজন প্রভাবশালী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বাসায়। এতে স্পষ্ট হয়, ক্ষমতা ও প্রভাব অনেক সময় অপরাধ আড়াল করার হাতিয়ারে পরিণত হয়। কিন্তু মানবাধিকার আইন স্পষ্টভাবে বলে, আইনের সামনে সবাই সমান। সামাজিক মর্যাদা কখনোই মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না।
এই ঘটনায় শুধু একজন শিশু নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে একটি জাতির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গৃহকর্মীর নামে শিশু শ্রম ও নির্যাতন বন্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হলে মানবাধিকারের ভাষা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশু গৃহকর্মী নিয়োগ বন্ধে রাষ্ট্রকে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নইলে একের পর এক শিশু নীরবে নির্যাতনের শিকার হতে থাকবে, আর সমাজ তা দেখেও না দেখার ভান করবে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের মাপকাঠি নির্ধারিত হয় তার শিশুদের প্রতি আচরণে। এই ঘটনায় মানবাধিকারের যে নির্মম লঙ্ঘন ঘটেছে, তার যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
১১ বছরের একটি শিশুকে গৃহকর্মীর নামে দাসত্বে পরিণত করে তার ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ক্ষমতা, প্রভাব ও শ্রেণি-অহংকারের নির্মম বহিঃপ্রকাশ। একটি শিশুকে হালকা কাজ-এর অজুহাতে বাসায় এনে তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা, নিয়মিত দেখা করতে না দেওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার করা, এসবই পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক অপরাধের আলামত।
আইনের চোখে এটি শুধু নৈতিক অধঃপতন নয়, শিশু আইন ও ফৌজদারি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োগ নিজেই অপরাধের শামিল। সেখানে ১১ বছরের একটি শিশুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো নিছক নিষ্ঠুরতা নয়, এটি বর্বরতা। এ ধরনের নির্যাতন শিশুর শরীরেই শুধু নয়, তার মানসিক বিকাশ, নিরাপত্তাবোধ ও মানবিক মর্যাদার ওপর স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এমন এক ব্যক্তির বাসায়, যিনি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন। ক্ষমতা ও পদমর্যাদা কোনোভাবেই অপরাধের ঢাল হতে পারে না। গৃহস্বামী হিসেবে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং এই দায় আরও গুরুতর, কারণ প্রভাবশালী অবস্থান থেকে সংঘটিত অপরাধ সমাজে ভয়ংকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, গৃহকর্মীর নামে শিশুদের ওপর নির্যাতন আজও কতটা নৃশংস রূপে বিদ্যমান। তাই এখানে সহানুভূতির ভাষা নয়, প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক বিচার। দোষীদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ বারবার ঘটতেই থাকবে। শিশু কোনো শ্রমের উপকরণ নয়; সে রাষ্ট্রের সুরক্ষার অধিকারী। এই সত্য অস্বীকার করা মানেই সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ করা।
বিমানের এমডি শফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন। তিনি বলেন, এই ঘটনা গৃহকর্মীদের ওপর কতটা নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
রাজেকুজ্জামান রতন উল্লেখ করেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সীমিত বা হালকা কাজে নিয়োগের কথা বলা হলেও শফিকুর রহমানের বাসায় যে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তার বয়স মাত্র ১১ বছর। ফলে এটি কোনোভাবেই বৈধ বা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, শিশু গৃহকর্মীর ওপর চালানো বর্বর নির্যাতনের দায় গৃহস্বামী হিসেবে শফিকুর রহমান কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
বাসদের এই নেতা মনে করেন, এ ঘটনায় শিশু আইন ও ফৌজদারি আইনে স্পষ্ট অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্মম ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


















