জন্মস্থানে অবহেলিত কিংবদন্তি শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বী, নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩:১৩:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২৬ বার পড়া হয়েছে
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাত্র দুদিন পর, ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অগণিত মরদেহের ভিড়ে পাওয়া গিয়েছিল এক বিভীষিকাময় নিথর দেহ। মুখ সামান্য হেলানো, বাঁ গাল ও কপালে বুলেটের চিহ্ন, সারা শরীরজুড়ে বেয়নেটের আঘাত, দু’চোখ উপড়ানো, হাত পেছনে গামছা দিয়ে বাঁধা। হৃদপিণ্ড ও কলিজা ছিন্নভিন্ন। এটি ছিল বিশ্বখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বীর মরদেহ। যাকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী ও আলবদররা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল।
বিশ্বখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট, আন্তর্জাতিক গবেষক, মানবিক চিকিৎসক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী—এই চারটি পরিচয় একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন ডা. ফজলে রাব্বী। অথচ বিজয়ের ৫৪ বছর পরও নিজ জন্মভূমি পাবনার হেমায়েতপুরের ছাতিয়ানী গ্রামে নেই তার নামে কোনো স্মৃতিচিহ্ন, প্রতিষ্ঠান বা স্মরণ আয়োজন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসেও জন্মস্থানে তাকে ঘিরে নেই কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে এই কিংবদন্তির স্মৃতি।
১৯৩২ সালে পাবনার হেমায়েতপুরের ছাতিয়ানী গ্রামে জন্ম নেওয়া ফজলে রাব্বী শৈশব থেকেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৪৮ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন কৃতিত্বের সঙ্গে। এরপর ঢাকা কলেজ হয়ে ১৯৫০ সালে ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। এমবিবিএস পরীক্ষায় অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজিতে সম্মানসহ শীর্ষস্থান অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক লাভ করেন। একই সময়ে সমগ্র পাকিস্তানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রসেক্টর পদে প্রথম স্থান অর্জন ছিল তার মেধার আরেক অনন্য স্বীকৃতি।

শুধু একাডেমিক কৃতিত্বেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। ঢাকা মেডিক্যালে পড়াশোনার সময় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। ছিলেন প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা। কবিতা আবৃত্তি, সংগীত ও মুক্তচিন্তার চর্চায় তিনি ছাত্রসমাজকে অনুপ্রাণিত করতেন।
মাত্র ৩০ বছর বয়সে, ১৯৬২ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানের অধীনে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারনাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজি-দুটি বিষয়ে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। এত অল্প বয়সে এই কৃতিত্ব আজও রয়্যাল কলেজের ইতিহাসে বিরল রেকর্ড। দেশে ফিরে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
গবেষণায়ও বিশ্বজয় করেছিলেন ডা. ফজলে রাব্বী। ১৯৬৪ সালে তার গবেষণা ‘A case of congenital hyperbilirubinaemia (Dubin-Johnson Syndrome)’ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। ১৯৭০ সালে ‘Spirometry in tropical pulmonary eosinophilia’ শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ জার্নাল ও ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে পরিচিত করে তোলে। ওই বছরই তিনি পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন—পাকিস্তানের ইতিহাসে এত কম সময়ে এ স্বীকৃতি আর কেউ পাননি।
তবে নির্যাতিত বাঙালির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। তার কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল সর্বোচ্চ সম্মান। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কার্ডিওলজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি ঢাকা মেডিক্যালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়েছেন। গোপনে ওষুধ ও অর্থ সহায়তা দিয়েছেন, নিজের গাড়ি ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য পৌঁছে দিয়েছেন। তার স্ত্রী ডা. জাহানারা রাব্বীও এই মানবিক কর্মকাণ্ডে পাশে ছিলেন।
১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর বিকেলে আলবদর ও পাকিস্তানি সেনারা তাকে নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তিন দিন পর ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাওয়া যায়।
ঢাকায় তার নামে একটি পার্ক ও মেডিক্যাল কলেজের একটি হল থাকলেও জন্মস্থান পাবনায় নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন। ২০০৮ সাল থেকে ‘শহীদ ডা. ফজলে রাব্বী স্মৃতি পরিষদ’ পাবনা মেডিক্যাল কলেজ তার নামে নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছে। মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর ও সভা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
ডা. ফজলে রাব্বীর চাচাতো ভাই সাইদ হাসান দারা বলেন, রাজনৈতিক অসহযোগিতার কারণে দীর্ঘদিনের দাবিও আলোর মুখ দেখেনি। পাবনা জেলা জাসদের সভাপতি মো. আমিরুর ইসলাম রাঙা বলেন, ডা. ফজলে রাব্বীর মতো একজন বিশ্বমানের চিকিৎসকের স্মৃতি সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তার আদর্শ তুলে ধরতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
জন্মভূমিতে স্মৃতিহীন হয়ে থাকা এই শহীদ বুদ্ধিজীবী আজও অপেক্ষায়-কবে জাতি তার ঋণ শোধ করবে।




















