চলতি শতাব্দীতেই বাংলাদেশে শীত প্রায় বিলুপ্তির আশঙ্কা: জলবায়ু প্রতিবেদন
- আপডেট সময় : ০৭:৩০:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫ ২৪৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে শীত ঋতু একটি বিরল ও প্রায় হারিয়ে যাওয়া মৌসুমে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে
প্রায় ১০ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে
জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ব্যাপক রূপান্তর ঘটতে চলেছে, এমনই সতর্কবার্তা উঠে এসেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের যৌথ সর্বশেষ প্রতিবেদনে।
‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বুধবার ঢাকায় প্রকাশ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই দেশের গড় দিনের তাপমাত্রা সাড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে শীত ঋতুই প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসন্ন কয়েক দশকে গ্রীষ্ম হবে আরও তীব্র, দীর্ঘ এবং দহনযন্ত্রণা সৃষ্টিকারী। গ্রীষ্মকালে ২ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ‘বাস্তবসম্মত’ অনুমান বলে উল্লেখ করা হয়। মার্চ থেকে মে বর্ষার আগে-পশ্চিমাঞ্চলে তাপপ্রবাহ বাড়বে বহুগুণ।

২০৭০ সালের মধ্যে এ সময়টিতে ২০ দিনের মতো তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
২১০০ সালের মধ্যে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগের ৯০ দিনের মধ্যে ৭০ দিনই তাপপ্রবাহ থাকতে পারে পশ্চিমাঞ্চলে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে তীব্র তাপপ্রবাহে পরিণত হবে।
ঢাকায় ভবিষ্যতে বছরে অন্তত দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা যাবে, একটি বর্ষার আগে, আরেকটি বর্ষার পরে অক্টোবর–নভেম্বরে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শৈত্যপ্রবাহ মূলত উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে শীত নিম্নগামী হয়ে বিলুপ্ত হতে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে উত্তরাঞ্চলেও ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে এক–দুই দিনের বেশি শৈত্যপ্রবাহ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শীত ঋতু একটি বিরল ও প্রায় হারিয়ে যাওয়া মৌসুমে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণা বলছে, আগামীতে বর্ষায় বৃষ্টিপাত বাড়বে আরও বেশি।
- ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষায় বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে ১১৮ মিলিমিটার
- ২১০০ সালের মধ্যে এ বৃদ্ধি পৌঁছাতে পারে ২৫৫ মিলিমিটারে।
সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়।
বিশ্বের গড় হারের চেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।
- প্রতিবছর উচ্চতা বাড়তে পারে ৫.৮ মি.মি., যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
- শতাব্দীর শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে উপকূলের ১৮% এলাকা ডুবে যেতে পারে।
- ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের ৯১৮ বর্গকিলোমিটার (২৩%) এলাকা পানিবন্দি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।

বর্ধিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, কলেরাসহ পানিবাহিত রোগ বাড়তে পারে। কৃষিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, ফসল উৎপাদন কমবে, গবাদিপশু ও মাছের উৎপাদন ব্যাহত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ২০১১ সাল থেকে যৌথভাবে কাজ করছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট।
কাজ শুরুর পর এটি ছিল তাদের তৃতীয় প্রতিবেদন, যেখানে পাঁচটি ভিন্ন পরিস্থিতির বিষয়ে পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে শতাব্দীর বাকি সময়কে দুটি ভাগ করা হয়েছে।
একটি ভাগের ব্যাপ্তি ২০৪১ থেকে ২০৭০ পর্যন্ত; আরেকটি বিস্তৃত ২০৭১ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন বজলুর রশিদ, যিনি প্রতিবেদনটি তৈরির ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষা মৌসুমের আগের তিন মাসে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২০ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যাবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১০০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগের ৯০ দিনের মধ্যে ৭০ দিনই তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এতে আরও বলা হয়, এছাড়া শৈত্যপ্রবাহ বেশির ভাগ সময় দেশের উত্তর, পশ্চিম ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় দেখা দিতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে শীত হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২১০০ সালের মধ্যে শীতকাল প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ওই সময় উত্তর ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে এক থেকে দুই দিন শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতামত
অনুষ্ঠানে বিশ্লেষকরা বলেন, প্রতিবেদনে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির অনুমান থাকলেও সম্ভাব্য বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়নি। তবুও প্রতিবেদনটিকে জলবায়ু পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো একক খাতের সমস্যা নয়; বরং এটি আমাদের সামগ্রিক ভবিষ্যতের ঝুঁকি।
এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল প্রভাবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও উষ্ণ, ভেজা, ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চয়তায় ভরা।



















