পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর টানা চারদিন ধরে উত্তাল। বিক্ষোভ ও ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে জনজীবন। সহিংসতায় এখন পর্যন্ত নয়জন নিহত হয়েছেন বলে সরকারি হিসাব। তবে বিক্ষোভকারীরা দাবি করছে, প্রাণহানির সংখ্যা ১৫ জন, যাদের মধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা। কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে লকডাউন কর্মসূচি শুরু করে জম্মু কাশ্মীর যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত এই সংগঠন ৩৮ দফা দাবি জানায়। সমঝোতা না হওয়ায় তারা ধর্মঘট ও বিক্ষোভে নামে। ফলে কয়েকটি জেলার কার্যক্রম অচল হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পুরো অঞ্চলে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রয়েছে।
আজাদ কাশ্মীরে জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। ২০২৩ সালের মে মাসে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিল ও ভর্তুকি দেওয়া গমের সংকট ঘিরে প্রথম প্রতিবাদ শুরু হয়। এরপর আগস্টে বিভিন্ন দাবিতে একত্রিত হয়ে গড়ে ওঠে জেএএসি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে মুজাফফরাবাদে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটি ঘোষণা করে।
পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরে কেন বিক্ষোভ, কী ঘটছে
২০২৪ সালের মে মাসে আন্দোলন প্রথম বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়। মুজাফফরাবাদের দিকে দীর্ঘ মিছিলের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গমের দাম ও বিদ্যুতের শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলে আন্দোলন স্থগিত হয়। তবে শান্তি স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের আগস্টে জেএএসি আবার নতুন লকডাউনের ডাক দেয়।
জেএএসি এবার যে ৩৮ দফা দাবি উত্থাপন করেছে তার মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো:
সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুবিধা বাতিল করা – বর্তমানে শীর্ষ কর্মকর্তারা একাধিক গাড়ি, দেহরক্ষী ও সীমাহীন জ্বালানিসহ নানা সুবিধা পান।
শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল – ১৯৪৭ সালের বিভাজনের পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীরা এসব আসন ধরে রেখেছে এবং উন্নয়ন তহবিল নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ।
বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা চালু করা।
নতুন অবকাঠামো প্রকল্প, টানেল ও সেতু নির্মাণ।
কর্মসংস্থান তৈরি ও কর মওকুফ।
পূর্বের আন্দোলনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহার।
পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরে কেন বিক্ষোভ, কী ঘটছে
সরকার জানিয়েছে, বেশিরভাগ দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব হলেও দুটি বিষয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে—শরণার্থীদের আসন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি সুবিধা।
আজাদ কাশ্মীরের অর্থমন্ত্রী আব্দুল মাজিদ খান বলেছেন, সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায়। তিনি দাবি করেন, আগের আন্দোলনের পর বেশ কিছু দাবি বাস্তবায়ন হয়েছে। নতুন দাবিগুলোও বিবেচনায় রয়েছে, তবে বড় পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। আলোচনায় অগ্রগতি হলে দ্রুতই ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জেএএসি অভিযোগ করছে, সরকার বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চাইছে।
বৃহস্পতিবার সরকারি প্রতিনিধি দল ও জেএএসি নেতাদের বৈঠক হলেও কোনো সমাধান আসেনি। শুক্রবার আবার আলোচনায় বসার কথা থাকলেও উভয়পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে সমাধান কবে নাগাদ হবে তা অনিশ্চিত।
আজাদ কাশ্মীরের চলমান বিক্ষোভ এখন কেবল অর্থনৈতিক অসন্তোষ নয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ন্যায্য সুবিধার দাবিতে রূপ নিয়েছে। সহিংসতা ও প্রাণহানির মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে, যার ফলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।