সংকটে হাওড়ার ফুসফুস
- আপডেট সময় : ১০:২৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ৭৫৪ বার পড়া হয়েছে
অনিমেষ দত্ত/ড: বিরাজলক্ষী ঘোষ
সাধারণভাবে জলমগ্ন এলাকা বা জল জায়গা হলো জলাভূমি।প্রকৃতপক্ষে কর্দমাক্ত জায়গা, নোনা জল জায়গা,পরিত্যক্ত নদীগর্ভ , খাল ,বিল, ঝিল ,পুকুর, ডোবা, সায়র প্রভৃতিকে জলাভূমি বা Wet Land বলা হয়।জলাভূমি প্রকৃতি বা মনুষ্য সৃষ্ট হতে পারে।আজকের পৃথিবীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলাভূমি সংরক্ষণ ও তার উন্নয়ন।
এককথায় বলা যায় পরিবেশের সুস্থতা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুস্থ জীবনযাত্রা বজায় রাখা ও জীবকুলের সহজ অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করার কাজে জলাভূমি অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। না না কারণেই জলাভূমি সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জলাভূমি ভূগর্ভে জল সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলস্তর এ জলের ভারসাম্য বজায় রাখে।
জলাশয় গুলি বাস্তুতন্ত্র তথা জীব বৈচত্র্য কে সুরক্ষিত করে ও জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ এর জীবনধারণ কে সুনিশ্চিত করে যার প্রভাব পড়ে সমস্ত পরিবেশের উপর।
জলাভূমি কে ঘিরে বিভিন্ন চাষ আবাদ ও বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়।
শহরাঞ্চলে দূষিত জল নিষ্কাশনে জলাভূমি গুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।জলাভূমি শহরের কিডনির কাজ করে।ময়লা জল জলাভূমিতে যুক্ত হলে তা প্রাকৃতিক উপায়ে শোধিত হয়।সূর্যরশ্মি,অক্সিজেন ও ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে ওই জল আসতে আসতে দূষণ মুক্ত হয়।
জলাভূমি আবার শহরের ফুসফুস।জলাভূমি মাধ্যমে সম্পাদিত হয় প্রাকৃতিক উপায়ে দূষণ মুক্তি রণের প্রক্রিয়া।যা মানুষকে একটু শুদ্ধ বাতাস দেয়।
পতিত জলাভূমি গুলিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে দূষণের মাত্রা অনেকটা কমানো যায়। সেকারণেই জলাভূমি ও তৎ সংলগ্ন বনাঞ্চল ও মুক্ত অঞ্চলগুলোকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই জলাভূমিকে কেন্দ্র করেই হাওড়ার ডুমুরজলা অঞ্চলে তৈরি হয়েছে এক বড় সমস্যা। পরিবেশকর্মী অনিমেষ দত্ত বলেন:সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা খুব জরুরি। ছোট থেকেই আমরা শুনে আসছি। আর সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে শরীর চর্চা, খেলাধূলা কতটা প্রয়োজনীয় তা আর বলে দিতে হয় না। বাড়ির কাছে বড়ো মাঠ থাকলে তো কথাই নেই। হইহই করে খেলতে চলে যাওয়া। এইভাবেই যৌবন কেটেছে অনেকেরই। হাওড়া শহরও তার ব্যতিক্রম নয়।

আর এই হাওড়া শহরের মধ্যে অবস্থিত ডুমুরজলা মাঠের সঙ্গে সকলেই কমবেশি পরিচিত। সকাল থেকেই ভিড় লেগে যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। হাফ প্যান্ট, জার্সি গায়ে দৌড়তে বা ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে। কিন্তু সেই ডুমুরজলা মাঠই যদি না থাকে? তাহলে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা, শরীর চর্চার অভ্যাস এসবও তো হারিয়ে যাবে!
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। ডুমুরজলা মাঠ হারিয়ে যেতে বসেছে। হাওড়া শহরের ফুসফুস নামে পরিচিত এই ডুমুরজলা এলাকা আর বেশিদিন বেঁচে থাকবে না। ‘খেল নগরী’র পরিকল্পনা করা হয়েছে এই অঞ্চলে।
একটু বিস্তারিত বলা উচিত। প্রথমত এই ডুমুরজলা এলাকা আগে চাষের জমি ছিল। চাষিদের থেকে শর্তসাপেক্ষে এই জমি নেওয়া হয়। শুধুমাত্র খেলাধূলা হবে বলেই। ঐতিহাসিক ভাবে এই এলাকায় তারপর থেকে খেলাধূলাই হয়ে এসেছে। মাঠ হয়েছে। জলাভূমি ছিলই। প্রাকৃতিক নিয়মে অসংখ্য গাছের সৃষ্টি হয়েছে। আর গাছ জলাভূমি একসাথে থাকার কারণেই প্রাকৃতিক নিয়মে অসংখ্য জীববৈচিত্র্যের আনাগোনা এই অঞ্চলে।
হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত মাঠে এসে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিক্স সহ একাধিক খেলাধূলার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। শুধু ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই নয়, সমস্ত বয়সের মানুষ প্রাণভরে শ্বাস নিতে, শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হাজির হয়েছেন এই এলাকায়। প্রগতির গুঁতোয় যেখানে হাওড়া শহরে এক এক করে গাছ কেটে, পুকুর বুজিয়ে, জলাভূমি বুজিয়ে ফ্ল্যাট-রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি তৈরি হতে হতে গেছে যতটা পরিমাণে; ঠিক ততটা পরিমাণে এই ডুমুরজলা এলাকা, মাঠ টিম টিম করে জ্বলতে থাকা প্রদীপের শিখার মতো আলো হয়ে কংক্রিটের জঙ্গলের বাইরে মানুষ ও হাজার হাজার প্রাণীর বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়েছে।
এখানে যেমন আছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, তেমনই আছে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বাস্তুতন্ত্র। পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে সাইবেরিয়ান পাখি তাইগা ফ্লাই ক্যাচার বিশেষ উল্লেখ্য। এছাড়াও বেনে বৌ, শিকরা বাজ, কূবো, ঘুঘু, মাছরাঙা, টিয়া, বক, জাকাণা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ; সাপ, বেজী, বিভিন্ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি এদের সবার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র এই অঞ্চল। যত দিন এগিয়েছে, এই এলাকাকেও কংক্রিটে পরিণত করার ছক তৈরি হয়েছে। পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। এই মাঠ যে জনজীবনের অংশ তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাটির ন্যায় মাঠটির চারপাশে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষতি এতেও সম্পূর্ণ হয়নি। এবার এই ডুমুরজলায় হতে চলেছে ‘খেল নগরী’।
খেলার জন্যই যখন, খেল নগরী হতে অসুবিধা কোথায়? আজ্ঞে ‘খেলা’ মানে শুধুই খেলা-ই বোঝায়। খেলার নগরীর মধ্যে ‘নগরায়ণ’ শব্দবন্ধ থাকায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এখানে কংক্রিটের আস্তরণ পড়তে চলেছে। আর নগরায়ণ মানে সেখানে বাড়িঘর, দোকানপাট হবে স্বাভাবিক! প্রথমে এইচআইটির আওতায় ছিল এখানকার ৫৫ একর জমি। তারপর সেখান থেকে আরবান ডেভলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টকে এই জমি দেওয়া হয়। এরপর শেষমেশ ‘হিডকো’-র কাছে চলে যায় জমি। আর হিডকোর কাজ হাউজিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করা। শোনা যাচ্ছে এই ‘খেল নগরী’
প্রোজেক্ট ‘পিপিপি মডেল’ (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হতে চলেছে। অর্থাৎ শুধু সরকার নয়, বেসরকারি কোম্পানিও ইনভেস্ট করবে এখানে। আর কোনও বেসরকারি কোম্পানিই নিজের মুনাফা ছাড়া কোনো কাজ করে না। ৬০ তলা শপিং কমপ্লেক্স, পার্কিং লট, হাউজিং কমপ্লেক্সও হবার কথা এখানে। ইতিমধ্যেই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (সিএবি)-কে ১৪ একর জমির বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এতো জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্রগত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা, শহরের মধ্যে এরকম ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে- গ্রীন বেঞ্চের এরকম নির্দেশ সত্ত্বেও কেন এই জায়গাটিকেই বেছে নেওয়া হল? ভৌগোলিক অবস্থানগত ভাবে এই এলাকাটি দ্বিতীয় হুগলি সেতুর একেবারে কাছে। ডুমুরজলার আশেপাশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। ব্যবসা ভালো হবে, তাই তো? কিন্তু এটা মাথায় রাখা গেল না যে, এরকম ফাঁকা জায়গা, এতো গাছ, এতো প্রাণী, মাটি থাকার জন্য হাওড়া জেলার মানুষ এখনও বেঁচেবর্তে আছেন। হাওড়া শহরের বেশকিছু জায়গায় প্রতিবছর জল জমা নতুন কিছু নয়।
কিন্তু সেটাও একটা পরিমাণ অবধিই। ডুমুরজলা অঞ্চলে নীচু জলাভূমি থাকায়, অনেকটা মাটির এলাকা থাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও সেই জল শুষে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাই বন্যা পরিস্থিতি এখনও অবধি তৈরি হতে পারেনি। কিন্তু এই প্রোজেক্ট সম্পন্ন হলে তো হাওড়া শহরে বন্যা হয়ে ভেসে যাবে! তখন আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম বানিয়েই বা কি লাভ হবে?
এলাকার ছেলেমেয়েরা কোথায় যাবে খেলতে? আট থেকে আশির অবাধ যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে, সকাল সকাল ওঠার অভ্যাস বজায় রাখতে এখানকার মানুষ কি করবেন? এতগুলো গাছ কেটে ফেললে, জলাভূমি বুজিয়ে দিলে হাওড়া শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে হারে বিঘ্নিত হবে, তা কি আর কখনও পুনর্জীবিত করা সম্ভব হবে? নিয়ম অনুযায়ী কোনো অঞ্চলে পুরনো গাছ কাটলে তার অনেক গুণ বেশি গাছ সেই অঞ্চলের কাছাকাছি কোন এলাকায় লাগাতে হবে, পরিচর্যা করতে হবে। কিন্তু অবস্থানগত ভাবে ডুমুরজলার আশেপাশে ডুমুরজলার থেকেও বড়ো ফাঁকা জায়গা এই মুহূর্তে অবশিষ্ট নেই। সেক্ষেত্রে প্রকৃতির উপর এতো বড়ো আঘাতের বদলা প্রকৃতি কি ভাবে নেবে মানুষ তা এখনও জানে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কীভাবে গোটা বিশ্বের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে আমরা সকলেই কমবেশি জানছি। কিন্তু যতটুকু বেঁচে আছে, সেটাকেও ‘উন্নয়ন’-এর নামে ধ্বংস করে দিয়ে আমরা কি আগামীদিনে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারব? অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ঘোরার সময় উপস্থিত হবে না তো? ডিজিটালাইজেশনের যুগে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেখানে সারাক্ষণ অনলাইন ক্লাস, মোবাইলে, ল্যাপটপে ব্যস্ত… সেখানে আরও বেশি করে দরকার খেলাধূলা, শরীরচর্চা, সকাল সকাল উঠে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসা। কিন্তু প্রকৃতিই যদি না থাকে তাহলে এসব হবে কি করে? মাঠই যদি না থাকে খেলাধূলা হবে কোথায়?
এইসমস্ত কিছু মাথায় রেখেই ডুমুরজলা এলাকার আশেপাশের মানুষ, পরিবেশপ্রেমী, ক্রীড়াপ্রেমীরা একজোট হয়েছেন ডুমুরজলা বাঁচাতে। স্লোগান তুলেছেন, ‘ডুমুরজলা থাক ডুমুরজলাতেই…’। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেলাধূলা করুক, প্রাণভরে শ্বাস নিক। প্রকৃতির মধ্যে বড়ো হয়ে উঠুক। গাছ ‘চিপকে’ থাকুক। খেলার মাঠ বাঁচুক। পাখিগুলো আসুক। কিচিরমিচির করুক। কীটপতঙ্গ গুলো বাঁচুক। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকুক। ডুমুরজলা বাঁচুক।
ডুমুরজলা —সুদীপ
স্টেডিয়ামে আছে কৃত্রিম ঘাস
মালি দেবে তাতে জল বারো মাস
হবে না সেখানে প্রাতঃভ্রমণ
হবে না সেখানে খেলা।
রাস্তার ধারে হবে আবাসন
বি জাতীয় ভাষা ,হবে আলাপন
ধোয়ায় ধোয়ায় অন্ধ যাপন
করে শুধু চোখ জ্বালা।
বহুদিন আগে সালকিয়া গেছে
ময়দান গেছে তার পিছে পিছে
বাকি হাওড়া বস্তিরো নিচে
তবু সব মুখে তালা।
কয়েকটা গাছ তবু বেঁচে ছিল
কয়েকটা মাছ তবু বেঁচে ছিল
মাঝে মাঝে তবু বেঁচে ছিল সেথা
জেলেদের জাল ফেলা।
নগরায়নের বিষ নিঃশ্বাস
শুষে নিচ্ছে
মাঠ ঘাট ঘাস।
ওপরে ঝোলানো ঘোলাটে আকাশ
ঘোলাটে চাঁদের থালা
কোনদিনও আর ফুটবেনা ফুল
বেঁচে থাকা শুধু পরিহাস, ভুল
প্রতিবাদ শুধু ছুটছে ,ব্যাকুল
নেতা হতে নিতে মালা।
পড়ে থাকে চাঁদ
পড়ে থাকে তারা
বিমর্ষ মন যেন সব হারা
একাকী একাকী ধর্ষিতা হয়
নিহত ডুমুর জলা।

























