সেচে জ্বালানি সংকট, বোরো উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ০৭:০৭:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের কৃষিখাতে, বিশেষ করে বোরো ধানের আবাদে। চলতি মৌসুমে প্রায় ২১০ লাখ মেট্রিক টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রায় ৪৯ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদ করা এই ফসলের বড় অংশই নির্ভর করছে সেচের ওপর।
আর সেই সেচ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি এখন সংকটে থাকা জ্বালানি। দেশজুড়ে প্রায় ১৬ লাখ সেচ পাম্প চালাতে এ মৌসুমে প্রয়োজন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ডিজেল। এ বছর শুধু সেচের জন্যই দরকার প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে দেশেও।
এতে ডিজেলের দাম বেড়েছে, পাশাপাশি অনেক এলাকায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সংকট তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সংকটের প্রভাব ভিন্নভাবে দেখা যাচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের কৃষক উজ্জ্বল কুন্ড জানান, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, ভেড়া ও উল্লাপাড়া এলাকায় অধিকাংশ সেচ পাম্পই বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় এখনো তেলের সংকট তুলনামূলক কম অনুভূত হচ্ছে। ফলে এসব অঞ্চলে সেচ কার্যক্রম মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পাশের নাটোর, রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের চিত্র ভিন্ন।
সেখানে সেচের জন্য ডিজেলনির্ভর পাম্পের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় কৃষকরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না, যা বোরো আবাদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবিউদ্দিন ফরাজি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলকে ফসলের ভাণ্ডার বলা হয়, অথচ সেখানকার কৃষকরাই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন। তিনি জানান, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনেও পড়তে পারে। তিনি বলেন, অনেক কৃষকের অভিযোগ তারা ডিজেল পান না, আর পেলেও দাম বেশি।

এভাবে চললে জমি শুকিয়ে যাবে। অপর একজন বলেছেন, তেল না পেলে ধান হবে না, ধান না হলে আমরা বাঁচব কীভাবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো মৌসুমে সেচে সামান্য ব্যাঘাতও উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু অঞ্চলে আবাদ ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কারণ, দেশের মোট ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশই আসে বোরো মৌসুম থেকে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ লাখের বেশি সেচযন্ত্রের মাধ্যমে প্রায় ৩৪ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে, যা পরিচালনায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল প্রয়োজন হয়।
ফলে সেচ ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশই চলে যায় জ্বালানিতে, যা কৃষকদের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহারও বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭০টি বৈদ্যুতিক পাম্প চালু রয়েছে। এগুলোর পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও, গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সৌরচালিত সেচ পাম্প। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং সরকার ও উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় এর বিস্তার বাড়ছে। এতে একদিকে জ্বালানি ব্যয় কমছে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাচ্ছে—যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
কৃষকদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা ও ভর্তুকি বাড়ানো না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাদের শঙ্কা, সময়মতো সেচ নিশ্চিত না হলে শুধু ফসল নয়, হুমকির মুখে পড়বে তাদের জীবন-জীবিকাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণই হতে পারে টেকসই কৃষি উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এখন দেখার বিষয়, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেয় সরকার, আর সেই উদ্যোগ কতটা দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়।

















