শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন: স্বাধীনতার পথে কলম ও সাহসের প্রতীক
- আপডেট সময় : ০৩:০৩:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩৭ বার পড়া হয়েছে
সেলিনা পারভীন (৩১ মার্চ ১৯৩১ – ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন সাপ্তাহিক বেগম, সাপ্তাহিক ললনা এবং শিলালিপি পত্রিকায় সম্পাদক এবং লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী একজন সাহসী নারী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদর বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ চালায়। ১৪ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করে নির্যাতন করার পর হত্যা করা হয়। চার দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে তার ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা হয়।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
সেলিনা পারভীনের জন্ম ফেনীর কল্যাণনগর গ্রামে ১৯৩১ সালে। তার পিতা মোঃ আবিদুর রহমান শিক্ষক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের ফেনীর বাড়ি দখল হয়ে যায়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে গল্প ও কবিতা লেখা শুরু করেন। গ্রামীণ কুসংস্কারের কারণে তার পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার অমতে তখনকার প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ে ১০ বছর স্থায়ী হয়। এরপর তিনি পুনরায় শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন, তবে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সফল হননি।
কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা
১৯৪৫ সাল থেকে সেলিনা পারভীন লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে হল পরিচালক হিসেবে চাকরি নেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতের অমিলের কারণে পরের বছর চাকরি ছেড়ে দেন। পরে তিনি একজন রাজনীতিককে বিয়ে করেন এবং সংসার শুরু করেন।
পেশাজীবী জীবনে তিনি ললনা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ শুরু করেন। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, তহবিল সংগ্রহসহ সব কাজ একাই পরিচালনা করতেন। অনেক সময় বেতনও পাননি। ১৯৬৯ সালে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় প্রকাশ করেন শিলালিপি পত্রিকা, যা তিনি সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্বে থাকতেন। শিলালিপি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লেখা প্রকাশের কারণে পাকিস্তানি শাসকের নজরে আসে। প্রায় সব বুদ্ধিজীবীর লেখা প্রকাশিত হওয়ায় পত্রিকাটি নজরকাড়া হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি সরকার একাধিকবার পত্রিকাটির সংখ্যা নিষিদ্ধ করলেও তিনি সাহসের সঙ্গে প্রকাশনা চালিয়ে যান।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মিছিল ও জনসভায় যোগ দিতেন। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সারের মতো বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তার বাসা হয়ে ওঠে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়কেন্দ্র। তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা তার কাছ থেকে ঔষধ, কাপড় ও অর্থ সংগ্রহ করত। শিলালিপি পত্রিকার আয়ের অর্থ দিয়েই তিনি এই সহায়তা করতেন।

দেশের নানা স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ চালালেও সেলিনা পারভীন সাহসী থাকতেন। ১৯৭১ সালের অগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে শিলালিপির সর্বশেষ সংখ্যা বের করার আগে পাকিস্তানি সেনারা তাকে লক্ষ্যবস্তু করে। সেই সময়ও তিনি নতুন প্রচ্ছদ না রেখে প্রকাশনা চালিয়ে যান। তার সাহসিকতা ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলে সবাইকে প্রভাবিত করে।
হত্যা ও শহীদত্ব
১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সিদ্ধেশ্বরীতে সেলিনা পারভীনের বাসায় পাকিস্তানি ও আল-বদর বাহিনী অভিযান চালায়। বাসায় তখন তার মা, পুত্র সুমন ও ভাই ছিলেন। সেদিন সকালে তারা ছাদে অবস্থান করছিলেন। সেলিনা পারভীন ছেলেকে তেল মেখে দিচ্ছিলেন এবং লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ গাড়ি থামলো, আল-বদর বাহিনী প্রধান গেইট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সেলিনা পারভীন নিজে দরজা খুলে দেন। তাদের সাথে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা শেষে তাকে অপহরণ করা হয়।
চার দিন পরে, ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে তার ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পায়ে তখনও সাদা মোজা পড়া ছিল, যা তাকে সনাক্তে সাহায্য করে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মতোই পাকিস্তানি দালাল বাহিনী সেলিনাকে হত্যা করে। ১৮ ডিসেম্বর আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা হয়।
উপসংহার
সেলিনা পারভীনের জীবন ও সাহস বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমর দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু কলমের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য লড়েননি, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি সহায়তায়ও অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল কেবল অস্ত্রের লড়াই নয়, সত্য ও কলমের সাহসী লড়াইও ছিল। সেলিনা পারভীন একজন সাহসী সাংবাদিক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, যাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করা গেলেও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়নি।




















