যেভাবে সাইবার জালে ধরা পড়ল ৪০ কোটি: সিআইডির অভিযানে ফেরত এলো পাচার হওয়া অর্থ
- আপডেট সময় : ০৬:৫২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ের নামে পরিচালিত প্রতারণামূলক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এমটিএফই (মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ)-এর মাধ্যমে পাচার হওয়া বিপুল অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। উদ্ধার করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি।
সোমবার (৩০ মার্চ) ঢাকায় সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, ‘এমটিএফই পঞ্জি স্কিম’-এর মাধ্যমে প্রতারণার একটি মামলা দায়ের হয় ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট খিলগাঁও থানায়। সেখানে এক ভুক্তভোগী প্রায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ করেন। তবে তদন্তে বেরিয়ে আসে, এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসংখ্য বিনিয়োগকারী কোটি কোটি টাকার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
সিআইডির তদন্তে জানা যায়, ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশে এমটিএফই কার্যক্রম শুরু করে। ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে কৃত্রিমভাবে লাভ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো বাস্তব লেনদেন ছিল না। নতুন বিনিয়োগ আনার জন্যই এই ভুয়া লাভ প্রদর্শন করা হতো।
প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করে চক্রটি। পরে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ করে তারা উধাও হয়ে যায়।
তদন্তে আরও জানা যায়, বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউএসডিটি (টিথার) একটি আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘ওকেএক্স’-এ সংরক্ষিত ছিল। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে এই অর্থের সঙ্গে প্রতারণা চক্রের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে ওকেএক্সের লিগ্যাল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেয় সিআইডি। আদালতের নির্দেশনায় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় সিআইডির নামে একটি সরকারি হিসাব খোলা হয়।
একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সহায়তায় পাচার হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বৈধ মুদ্রায় রূপান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার সোনালী ব্যাংকের ওই হিসাবে জমা হয়।
সিআইডি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার ফলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে এ অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পাশাপাশি পাচার হওয়া বাকি অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, উচ্চ মুনাফার লোভে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন। কেউ কেউ টাকা জোগাড় করতে স্বর্ণালংকার ও জমিজমাও বিক্রি করছেন। কিন্তু সামাজিক কারণে অনেক ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন না। তাই গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও জানান, এই প্রতারণার শিকার মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ অনেকেই এখনও সামনে আসেননি। তবে সিআইডি আইনি প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দিতে কাজ করে যাচ্ছে।



















