মানুষই ছিল অ্যালার্ম ঘড়ি: ব্রিটেন-আয়ারল্যান্ডের এক বিস্মৃত পেশার গল্প
- আপডেট সময় : ০৭:২৪:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
ঊনবিংশ শতকে শিল্পবিপ্লবের সময় ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের বহু শিল্পশহরে এক অদ্ভুত কিন্তু প্রয়োজনীয় পেশার মানুষের দেখা মিলত তাদের বলা হতো নকার-আপার (Knocker-up)। এই পেশার মূল কাজ ছিল কারখানার শ্রমিকদের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া। সে সময় অ্যালার্ম ঘড়ি সাধারণ মানুষের কাছে সস্তা বা সহজলভ্য ছিল না, আর কারখানার কাজ শুরু হতো খুব ভোরে। ফলে সময়মতো জেগে ওঠা অনেক শ্রমিকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ত। এই সমস্যার সমাধান করতেন নকার-আপাররা।
ভোরবেলা তারা শহরের বিভিন্ন বাড়ির সামনে গিয়ে লম্বা লাঠি বা বাঁশ দিয়ে জানালায় টোকা দিতেন। উঁচু তলার জানালায় পৌঁছাতে তারা হালকা কিন্তু লম্বা কাঠি ব্যবহার করতেন। অনেক সময় সরু নল বা রাবারের পাইপ দিয়ে শুকনো মটরশুঁটি ছুড়ে জানালায় আঘাত করতেন, যাতে ভেতরের মানুষ জেগে ওঠে। শুধু টোকা দিয়েই তারা চলে যেতেন না, ভেতর থেকে কেউ জেগে ওঠার ইঙ্গিত না দেওয়া পর্যন্ত অনেকেই জানালার সামনে অপেক্ষা করতেন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ব্যক্তি সত্যিই ঘুম থেকে উঠেছেন।
এই কাজের বিনিময়ে নকার-আপাররা সপ্তাহে কয়েক পেন্স পারিশ্রমিক পেতেন। শিল্পবিপ্লবের সময় ম্যানচেস্টারসহ বড় শিল্পশহরগুলোতে এই পেশা বেশ প্রচলিত ছিল। সাধারণত বয়স্ক পুরুষ ও নারী, এমনকি কখনও গর্ভবতী মহিলারাও এই কাজ করতেন। কিছু ক্ষেত্রে ভোরের টহলের সময় পুলিশ কনস্টেবলরাও অতিরিক্ত আয়ের জন্য এই দায়িত্ব পালন করতেন।

১৯৩১ সালে পূর্ব লন্ডনে তোলা একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, একজন নকার-আপার সরু নল দিয়ে মটরশুঁটি ছুড়ে জানালায় আঘাত করে মানুষকে জাগিয়ে দিচ্ছেন। মেরি স্মিথ ও তাঁর কন্যা মলি মুরও এই পেশার পরিচিত নাম, তারা দীর্ঘ রাবার নল ব্যবহার করে ক্লায়েন্টদের জানালায় শুকনো মটরশুঁটি ছুড়ে ঘুম ভাঙাতেন।
ইংল্যান্ডের কাউন্টি ডারহামের ফেরিহিল অঞ্চলে খনি শ্রমিকদের বাড়ির বাইরে স্লেট বোর্ড লাগানো থাকত। সেখানে শ্রমিকরা চক দিয়ে নিজেদের কাজের শিফটের সময় লিখে রাখতেন, যাতে নকার-আপাররা নির্দিষ্ট সময়ে এসে তাদের জাগিয়ে দিতে পারেন। এই বোর্ডগুলোকে বলা হতো নকি-আপ বোর্ড বা জাগানো স্লেট।
১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে অ্যালার্ম ঘড়ি ধীরে ধীরে সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠলে এই পেশার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। ফলে নকার-আপারদের কাজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। শিল্প ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় অবশ্য ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত এই পেশার অস্তিত্ব ছিল। পরে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নকার-আপার পেশাটি সম্পূর্ণরূপে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
.

















