বুড়িগঙ্গায় বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ ঐতিহ্যের রঙে মুখর রাজধানী
- আপডেট সময় : ১১:৫১:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে
বুড়িগঙ্গার ঢেউ আর বৈঠার ছন্দে যেন নতুন করে ধরা দিয়েছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, প্রাণ ও নাগরিক আনন্দের এক অপূর্ব ছবি
রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মাসব্যাপী আয়োজন ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের অংশ হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। বাংলার চিরচেনা নদী, নৌকা ও লোকজ সংস্কৃতির এই আয়োজন ঘিরে শুক্রবার বুড়িগঙ্গার দুই তীরে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। সকাল থেকেই নদীর পাড়ে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
দুপুর গড়াতেই হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও নানা বয়সী দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে নদীর তীর। নদীর বুকে শত শত নৌকা ও ট্রলারে পরিবার-পরিজন নিয়ে নাগরিকদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে পরিণত করে এক বর্ণিল মিলনমেলায়।
শুক্রবার বিকেলে বুড়িগঙ্গার খোলামোড়া ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ছয়টি দল এতে অংশ নেয়। প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে নদীর দুই তীরে দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের বাইরে এমন একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। নৌকার বৈঠার ছন্দ, প্রতিযোগীদের হইচই এবং দর্শকদের করতালিতে পুরো বুড়িগঙ্গার পরিবেশ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
নৌকা বাইচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ঢাকার চারপাশের নদ-নদী দখল ও দূষণমুক্ত করে নৌচলাচল অবাধ, সচল ও নিরাপদ করতে সরকার কাজ করছে। বুড়িগঙ্গা, বালু ও ধলেশ্বরীসহ ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ডিএসসিসির এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে নদীর তীরকে সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে মানুষের হাঁটাচলা, অবসর ও বিনোদনের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিযোগিতা শেষে সোয়ারীঘাট প্রাঙ্গণে নোঙর করা শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী স্টিমার ‘পিএস মাহমুদ’-এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইশরাক হোসেন বলেন, ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় নৌকা বাইচ একটি অনন্য উদ্যোগ। ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। আদি ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই নগরীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি হবে। আর সেই ভালোবাসা থেকেই পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ সফল হবে।
তিনি জানান, ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের মাধ্যমে ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। উৎসবের অংশ হিসেবে মিনি ম্যারাথন, সাইকেল র্যালি, নাট্য উৎসব ও চলচ্চিত্র উৎসবসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকার উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় আট লেনের সড়ক নির্মাণ এবং নদীর পাড় বাঁধাই করে দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ তৈরির মতো বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নগরবাসীকে পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং বেশি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদের দল। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোশারফ হোসেন খোকনের দল। তৃতীয় হয় মাদারীপুরের আনিসুর রহমানের দল।
অনুষ্ঠানে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বুড়িগঙ্গার তীরে ফিরেছে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির প্রাণচাঞ্চল্য, অন্যদিকে নগরবাসীর মধ্যেও তৈরি হয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এমন আয়োজন ঢাকার সাংস্কৃতিক শিকড়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। বুড়িগঙ্গার ঢেউ আর বৈঠার ছন্দে যেন নতুন করে ধরা দিয়েছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, প্রাণ ও নাগরিক আনন্দের এক অপূর্ব ছবি।


















